Conflict Zone - Israel-Palestine

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইতিহাসঃ ব্রিটিশ ম্যান্ডেট, বেলফোর ঘোষণা ও আরব বিদ্রোহ

প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি কীভাবে উসমানীয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে ব্রিটেন পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতির একটি জাল বুনেছিল। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে সেই জালের একটি সুতো আনুষ্ঠানিক নথিতে রূপ নেয় যা বেলফোর ঘোষণা নামে পরিচিত। এই একটিমাত্র চিঠি, যা আসলে একটি ব্রিটিশ মন্ত্রীর কাছ থেকে একজন ব্যক্তিগত ইহুদি ব্যাংকারের উদ্দেশ্যে লেখা। এই একটি চিঠিই পরবর্তী একশ বছরের ভূরাজনীতির দিকনির্দেশক দলিলে পরিণত হবে। এই পর্বে আমরা অনুসরণ করব কীভাবে এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোয় রূপান্তরিত হলো। কীভাবে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট প্রশাসন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ব্যর্থ হলো এবং কীভাবে ১৯৩৬-৩৯ সালের মহান আরব বিদ্রোহ ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক শক্তিকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করল যে তার প্রভাব ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত টের পাওয়া যাবে।

লেখক Mishu Afrin Juthi
সময় ১০/০৮/২৬ ০৫:৫৫:০১
Facebook LinkedIn X (Twitter) WhatsApp Share
সারাংশ

প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি কীভাবে উসমানীয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে ব্রিটেন পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতির একটি জাল বুনেছিল। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে সেই জালের একটি সুতো আনুষ্ঠানিক নথিতে রূপ নেয় যা বেলফোর ঘোষণা নামে পরিচিত। এই একটিমাত্র চিঠি, যা আসলে একটি ব্রিটিশ মন্ত্রীর কাছ থেকে একজন ব্যক্তিগত ইহুদি ব্যাংকারের উদ্দেশ্যে লেখা। এই একটি চিঠিই পরবর্তী একশ বছরের ভূরাজনীতির দিকনির্দেশক দলিলে পরিণত হবে। এই পর্বে আমরা অনুসরণ করব কীভাবে এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোয় রূপান্তরিত হলো। কীভাবে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট প্রশাসন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ব্যর্থ হলো এবং কীভাবে ১৯৩৬-৩৯ সালের মহান আরব বিদ্রোহ ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক শক্তিকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করল যে তার প্রভাব ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত টের পাওয়া যাবে।

The Balfour Declaration: Jonathan Schneer
"এটি ছিল ৬৭টি শব্দের একটি বাক্য, যা এক শতাব্দী ধরে রক্তক্ষরণ ঘটাবে।"
— জোনাথন শ্‌নিয়ার, ইতিহাসবিদ


প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি কীভাবে উসমানীয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে ব্রিটেন পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতির একটি জাল বুনেছিল। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে সেই জালের একটি সুতো আনুষ্ঠানিক নথিতে রূপ নেয় যা বেলফোর ঘোষণা নামে পরিচিত। এই একটিমাত্র চিঠি, যা আসলে একটি ব্রিটিশ মন্ত্রীর কাছ থেকে একজন ব্যক্তিগত ইহুদি ব্যাংকারের উদ্দেশ্যে লেখা। এই একটি চিঠিই পরবর্তী একশ বছরের ভূরাজনীতির দিকনির্দেশক দলিলে পরিণত হবে।


এই পর্বে আমরা অনুসরণ করব কীভাবে এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোয় রূপান্তরিত হলো। কীভাবে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট প্রশাসন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ব্যর্থ হলো এবং কীভাবে ১৯৩৬-৩৯ সালের মহান আরব বিদ্রোহ ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক শক্তিকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করল যে তার প্রভাব ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত টের পাওয়া যাবে।


বেলফোর ঘোষণা: কূটনীতির পেছনের কূটনীতি

১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি লেখেন লর্ড রথচাইল্ডের উদ্দেশ্যে, যা ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। চিঠিতে ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করে যে তারা "ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠাকে অনুকূল দৃষ্টিতে দেখে" এবং "এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালনের জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাবে।" কিন্তু চিঠির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তসাপেক্ষ অংশও ছিল সেখানে স্পষ্ট করে বলেছিল যে "ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অ-ইহুদি সম্প্রদায়ের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার" ক্ষুণ্ণ করা যাবে না। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ফিলিস্তিনের তৎকালীন জনসংখ্যার নব্বই শতাংশেরও বেশি যে আরব জনগোষ্ঠী ছিল, তাদের এই ঘোষণায় "অ-ইহুদি সম্প্রদায়" হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বা জাতীয় অধিকারের কোনো স্বীকৃতি ছাড়াই।


বেলফোর ঘোষণা, ২ নভেম্বর ১৯১৭ — মূল বাক্যাংশ

"His Majesty's Government view with favour the establishment in Palestine of a national home for the Jewish People and will use their best endeavours to facilitate the achievement of this object, it being clearly understood that nothing shall be done which may prejudice the civil and religious rights of existing non-Jewish communities in Palestine."


এই ঘোষণার পেছনে ব্রিটিশ যুদ্ধকালীন কৌশলগত হিসাব-নিকাশ জড়িত ছিল। কেমিস্ট ও জায়নবাদী নেতা চেইম ওয়াইজম্যানের সাথে ব্রিটিশ যুদ্ধ মন্ত্রিসভার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি জনমতকে যুদ্ধপ্রচেষ্টার পক্ষে রাখার আকাঙ্ক্ষা এবং যুদ্ধোত্তর মধ্যপ্রাচ্যে ফরাসি প্রভাবের বিপরীতে সুয়েজ খাল রক্ষার জন্য একটি বন্ধুত্বপূর্ণ ফিলিস্তিনের কৌশলগত মূল্য। ঘোষণাটি মন্ত্রিসভায় বিতর্কহীন ছিল না। একমাত্র ইহুদি মন্ত্রী এডউইন মন্টেগু তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, এই যুক্তিতে যে এটি বিশ্বব্যাপী ইহুদিদের প্রতি দ্বৈত আনুগত্যের সন্দেহ তৈরি করবে। তা সত্ত্বেও ঘোষণাটি অনুমোদিত হয় এবং দ্রুতই আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হয়।


ঐতিহাসিকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে ঘোষণার প্রকৃত প্রণোদনা নিয়ে। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে যুদ্ধকালীন প্রচারণাগত বিবেচনা ছিল প্রধান নিয়ামক, আবার কেউ কেউ মনে করেন লয়েড জর্জ ও বেলফোরের ব্যক্তিগত ধর্মীয়-রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। যা নিশ্চিতভাবে বলা যায় তা হলো ঘোষণাটি প্রণয়নের সময় ফিলিস্তিনের স্থানীয় আরব জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধির সাথে পরামর্শ করা হয়নি এবং ঘোষণাটি প্রকাশের বহু মাস পরও অধিকাংশ ফিলিস্তিনি এর অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।


সান রেমো থেকে ম্যান্ডেট দলিল

১৯২০ সালের এপ্রিলে ইতালির সান রেমোতে অনুষ্ঠিত মিত্রশক্তি সম্মেলনে বেলফোর ঘোষণাকে আন্তর্জাতিক আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফিলিস্তিনের ম্যান্ডেট ব্রিটেনকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের মধ্যে ঘোষণার ভাষা প্রায় হুবহু অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯২২ সালের জুলাইয়ে লীগ অব নেশনস আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অনুমোদন করে, যার প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে বলা হয় যে ম্যান্ডেটরি শক্তি "ইহুদি জনগণের ফিলিস্তিনের সাথে ঐতিহাসিক সংযোগ" এবং তাদের "জাতীয় আবাসভূমি পুনর্গঠনের ভিত্তি" স্বীকার করে। এভাবে একটি যুদ্ধকালীন কূটনৈতিক চিঠি একটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপান্তরিত হয়। এবং পরবর্তীতে এটি ফিলিস্তিনি আরব নেতৃত্বের কাছে গভীর অবিচার হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ তাদের মতে এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় জনগণের সম্মতি নেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠেনি।


১৯২০ সালের জুলাইয়ে হার্বার্ট স্যামুয়েল ফিলিস্তিনের প্রথম ব্রিটিশ হাই কমিশনার নিযুক্ত হন। একজন উদার ইহুদি রাজনীতিবিদ, যিনি নিজেই একসময় জায়নবাদী প্রকল্পের একজন প্রাথমিক ব্রিটিশ সমর্থক ছিলেন। তার নিয়োগ আরব নেতৃত্বের সন্দেহকে আরও গভীর করে, যদিও স্যামুয়েল প্রশাসনিকভাবে সতর্ক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। এই একই সময়ে দামেস্কে এক ভিন্ন নাটক প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। শরিফ হুসেইনের পুত্র ফয়সাল, যিনি ১৯১৯ সালে ওয়াইজম্যানের সাথে একটি শর্তসাপেক্ষ সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন (যেখানে তিনি ব্যাপক আরব স্বাধীনতা লাভের বিনিময়ে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসনে আপত্তি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন), ১৯২০ সালের জুলাইয়ে ফরাসি বাহিনীর হাতে দামেস্ক থেকে বিতাড়িত হন। ফয়সাল-ওয়াইজম্যান চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আরব স্বাধীনতা পূরণ না হওয়ায় চুক্তিটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে, এবং আরব রাজনৈতিক নেতৃত্বে জায়নবাদের সাথে সমঝোতার সম্ভাবনা আরও সংকুচিত হয়ে যায়।


একটি চিঠি, একটি সম্মেলন, একটি ম্যান্ডেট দলিল । এই তিন ধাপে বেলফোরের ৬৭টি শব্দ আন্তর্জাতিক আইনের অংশ হয়ে ওঠে, স্থানীয় জনগণের সম্মতি ব্যতিরেকেই।


প্রথম দাঙ্গা ও চার্চিল শ্বেতপত্র

১৯২০ সালের এপ্রিলে জেরুজালেমে "নবী মুসা" উৎসবের সময় প্রথম বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যাতে বেশ কয়েকজন নিহত হন। এক বছর পর, ১৯২১ সালের মে মাসে জাফায় আরও গুরুতর দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে মে দিবসের কমিউনিস্ট মিছিল ঘিরে উত্তেজনা থেকে শুরু হওয়া সহিংসতায় প্রায় নব্বই জন নিহত হন উভয় সম্প্রদায় থেকেই। এই দাঙ্গার প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশ সরকার হেইক্র্যাফট তদন্ত কমিশন গঠন করে, যার প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো স্বীকার করা হয় যে সহিংসতার মূল কারণ আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে জায়নবাদী অভিবাসন নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।


এই উপলব্ধির ভিত্তিতে ১৯২২ সালে ঔপনিবেশিক সচিব উইনস্টন চার্চিল একটি নীতিগত শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন, যা "চার্চিল শ্বেতপত্র" নামে পরিচিত। এতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রথমত, জর্ডান নদীর পূর্বাংশকে পৃথক করে ট্রান্সজর্ডান আমিরাত গঠন করা হয়, যেখানে ইহুদি জাতীয় আবাসভূমি নীতি প্রযোজ্য হবে না এবং দ্বিতীয়ত, ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসন সীমাবদ্ধ করা হয় দেশের "অর্থনৈতিক শোষণক্ষমতা" অনুযায়ী। যদিও বেলফোর ঘোষণার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এই নীতি কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। জায়নবাদী নেতৃত্ব একে প্রতিশ্রুত ভূখণ্ডের সংকোচন হিসেবে দেখে, আর আরব নেতৃত্ব একে অপর্যাপ্ত হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ এতে অভিবাসন সম্পূর্ণ বন্ধ করার কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না।


১৯২৯: পশ্চিম প্রাচীরের দাঙ্গা

১৯২৯ সালের আগস্টে জেরুজালেমের পশ্চিম প্রাচীরে (যা ইহুদিদের কাছে ওয়েইলিং ওয়াল নামে পরিচিত এবং যার নিকটবর্তী এলাকা মুসলিমদের কাছে হারাম আশ-শরিফের অংশ) প্রার্থনা অনুষ্ঠান ঘিরে উত্তেজনা দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় রূপ নেয়। জেরুজালেম, হেবরন ও সাফেদে ব্যাপক সহিংসতায় প্রায় ১৩৩ জন ইহুদি ও ১১৬ জন আরব নিহত হন যাদের অধিকাংশই ব্রিটিশ পুলিশের গুলিতে। হেবরনের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেখানে শতাব্দীপ্রাচীন একটি ছোট ইহুদি সম্প্রদায়ের ৬৭ জন সদস্য নিহত হন এবং বেঁচে যাওয়া ইহুদিরা শহর ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। একটি সম্প্রদায় যাদের সাথে জায়নবাদী রাজনৈতিক আন্দোলনের সরাসরি সম্পর্ক ছিল না, কিন্তু যারা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার শিকার হন।


দাঙ্গা নিয়ে একটি কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের তদন্তের পর ব্রিটিশ সরকার ১৯৩০ সালে পাসফিল্ড শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, যা জমি বিক্রি ও অভিবাসনে আরও কঠোর বিধিনিষেধের সুপারিশ করে। কিন্তু জায়নবাদী আন্দোলনের তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে ১৯৩১ সালে প্রধানমন্ত্রী রামজে ম্যাকডোনাল্ড একটি চিঠির মাধ্যমে কার্যত এই নীতি প্রত্যাহার করে নেন। যে চিঠি আরব রাজনৈতিক মহলে "কালো পত্র" নামে কুখ্যাত হয়ে ওঠে। এই ঘটনাক্রম একটি পুনরাবৃত্ত প্যাটার্নের জন্ম দেয় যা পুরো ম্যান্ডেট যুগ জুড়ে অব্যাহত ছিল সহিংসতা, তদন্ত কমিশন, নীতিগত সুপারিশ, এবং অবশেষে জায়নবাদী রাজনৈতিক চাপে সেই সুপারিশের ক্ষয়প্রাপ্তি।


চতুর্থ ও পঞ্চম আলিয়া: জনতাত্ত্বিক রূপান্তরের ত্বরণ

১৯২৪-২৯ সালের "চতুর্থ আলিয়া"য় পোল্যান্ড থেকে প্রায় ৮০,০০০ ইহুদি অভিবাসী আসেন, যাদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত শহুরে পেশাজীবী ছিলেন এবং তেল আবিবের নগর অর্থনীতিকে দ্রুত সম্প্রসারিত করেন। কিন্তু জনতাত্ত্বিক রূপান্তরের সবচেয়ে নাটকীয় পর্যায় আসে ১৯৩৩ সালের পর, যখন জার্মানিতে হিটলারের ক্ষমতা গ্রহণের পর "পঞ্চম আলিয়া" শুরু হয়। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে প্রায় ২৫০,০০০ ইহুদি যাদের একটি বড় অংশ নাৎসি জার্মানি ও মধ্য ইউরোপ থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনে প্রবেশ করেন। এই সময়ে ইহুদি জনসংখ্যা ১৯২২ সালের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৩৯ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছায় । একটি জনতাত্ত্বিক রূপান্তর যা আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে অস্তিত্বগত উদ্বেগকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। এই দশকেই ইউরোপে ইহুদিদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমশ যত ভয়াবহ হয়ে উঠছিল, ফিলিস্তিনে জায়নবাদী প্রকল্পের জরুরিত্ব ততই তীব্রতর হয়ে উঠছিল। একটি দ্বান্দ্বিকতা যা পরবর্তী সংঘাতের নৈতিক জটিলতাকে আরও গভীর করে তোলে।


মহান আরব বিদ্রোহ, ১৯৩৬-৩৯

এই ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৩৬ সালের এপ্রিলে, যখন জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতি হাজ আমিন আল-হুসাইনির নেতৃত্বে গঠিত আরব উচ্চ কমিটি একটি সাধারণ ধর্মঘট ঘোষণা করে, যার দাবি ছিল ইহুদি অভিবাসন সম্পূর্ণ বন্ধ, জমি বিক্রি নিষিদ্ধকরণ এবং একটি প্রতিনিধিত্বমূলক জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা। প্রায় ছয় মাস স্থায়ী এই ধর্মঘট ফিলিস্তিনি ইতিহাসে দীর্ঘতম সাধারণ ধর্মঘট হিসেবে চিহ্নিত, যা ধীরে ধীরে একটি সশস্ত্র গেরিলা বিদ্রোহে রূপান্তরিত হয় বিশেষত ১৯৩৭-৩৮ সালে, যখন গ্রামীণ এলাকায় ব্রিটিশ প্রশাসন ও জায়নবাদী স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলা চালানো হয়।


ব্রিটিশ প্রতিক্রিয়া ছিল নির্মম। সামরিক আইন জারি, গণগ্রেপ্তার, বাড়িঘর ধ্বংস এবং কঠোর দমনাভিযান, যাতে হাগানাহ ও পরবর্তীতে বিতর্কিত ইরগুনের মতো ইহুদি আধা-সামরিক সংগঠনগুলোও ব্রিটিশদের সহযোগী হিসেবে যুক্ত হয়। এই সময়েই ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা অর্ড উইনগেট গঠন করেন "স্পেশাল নাইট স্কোয়াড", যেখানে হাগানাহ সদস্যরা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক ব্রিটিশ সামরিক প্রশিক্ষণ ও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। একটি অভিজ্ঞতা যা এক দশক পরে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রাথমিক কমান্ড কাঠামো গঠনে সরাসরি অবদান রাখবে। ১৯৩৯ সাল নাগাদ বিদ্রোহ দমিত হয়, কিন্তু এর মূল্য ছিল বিপর্যয়কর। আনুমানিক পাঁচ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন, যাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিলেন রাজনৈতিক নেতা, সংগঠক ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি।


এই বিদ্রোহ ফিলিস্তিনি সমাজকে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে এতটাই দুর্বল করে দেয় যে এক দশক পরে ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় তারা একটি সুসংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হবে যেখানে একই সময়ে ইহুদি সামরিক সংগঠনগুলো ব্রিটিশদের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। বিদ্রোহের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ফিলিস্তিনি ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। হুসাইনি ও নাশাশিবি পরিবারের মধ্যকার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদ্রোহের সময় গুপ্তহত্যা ও অভ্যন্তরীণ সহিংসতায় রূপ নেয়, যাতে বহু ফিলিস্তিনি "সহযোগী" সন্দেহে নিজেদের সম্প্রদায়ের সদস্যদের হাতেই নিহত হন।


বিদ্রোহের প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৭ সালে পিল কমিশন গঠন করে, যা প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন বিভাজনের প্রস্তাব উত্থাপন করে। একটি ক্ষুদ্র ইহুদি রাষ্ট্র, একটি বৃহত্তর আরব রাষ্ট্র (যা ট্রান্সজর্ডানের সাথে একীভূত হবে) এবং জেরুজালেমসহ একটি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত করিডোর। জায়নবাদী নেতৃত্ব শর্তসাপেক্ষে এই প্রস্তাব বিবেচনায় নিলেও আরব উচ্চ কমিটি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে, এবং পরবর্তী উডহেড কমিশন প্রস্তাবটিকে বাস্তবায়নের অযোগ্য ঘোষণা করে বাতিল করে দেয়।


১৯৩৯ শ্বেতপত্র: শেষ মুহূর্তের নীতি বিপর্যয়

ইউরোপে যুদ্ধের ঘনায়মান মেঘের মধ্যে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৯ সালের মে মাসে একটি চূড়ান্ত শ্বেতপত্র প্রকাশ করে, যা পরবর্তী পাঁচ বছরে ইহুদি অভিবাসন ৭৫,০০০ জনে সীমাবদ্ধ করে এবং তারপর আরব সম্মতি ছাড়া অভিবাসন সম্পূর্ণ বন্ধের প্রস্তাব দেয়, পাশাপাশি জমি বিক্রিতে কঠোর ভৌগোলিক বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং দশ বছরের মধ্যে একটি স্বাধীন, আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এই নীতি ঐতিহাসিকভাবে বিয়োগান্তক এক সময়ে আসে ঠিক যখন ইউরোপীয় ইহুদিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠছিল, তখনই ব্রিটেন ফিলিস্তিনের দরজা কার্যত বন্ধ করে দেয়। জায়নবাদী নেতৃত্ব এই শ্বেতপত্রকে বেলফোর প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করে এবং যুদ্ধ চলাকালীনও ব্রিটিশ বিরোধী অবস্থান তীব্রতর করতে থাকে, যদিও নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা একই সাথে ব্রিটেনের পাশে দাঁড়ায়। আরব নেতৃত্বও এই শ্বেতপত্রকে অপর্যাপ্ত মনে করে, কারণ ততদিনে বিদ্রোহ-বিধ্বস্ত নেতৃত্ব রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল এর সম্পূর্ণ সুবিধা আদায় করার মতো অবস্থানে থাকার জন্য।

P

দ্য পেপিরাস ভার্ডিক্ট

ব্রিটিশ ম্যান্ডেট যুগের ২৫ বছর একটি একক প্যাটার্নে চিহ্নিত — সহিংসতা, তদন্ত কমিশন, নীতিগত প্রতিশ্রুতি এবং পরে সেই প্রতিশ্রুতির ক্ষয়প্রাপ্তি, যার প্রতিটি চক্র উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থাহীনতাকে আরও গভীর করেছে। কিন্তু এই যুগের সবচেয়ে সিদ্ধান্তমূলক পরিণতি ছিল অসম প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ — মহান আরব বিদ্রোহ ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে ধ্বংস করে দিয়েছিল ঠিক তখনই, যখন জায়নবাদী সামরিক সংগঠনগুলো ব্রিটিশ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। ১৯৪৫ সালে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় এবং হলোকাস্টের পূর্ণ ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়, তখন এই অসম শক্তি সমীকরণই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পর্বের যুদ্ধের ফলাফল — যা আমরা তৃতীয় পর্বে বিশ্লেষণ করব।


সূত্র নির্দেশিকা: এই প্রবন্ধের তথ্যাদি ব্রিটিশ সরকারি নথি (বেলফোর ঘোষণা, শ্বেতপত্রসমূহ, লীগ অব নেশনস ম্যান্ডেট দলিল) এবং প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসগ্রন্থ (Jonathan Schneer, Tom Segev, Rashid Khalidi) নির্ভর। হতাহতের সংখ্যা বিভিন্ন সমসাময়িক ব্রিটিশ তদন্ত প্রতিবেদন থেকে নেওয়া আনুমানিক পরিসংখ্যান, যা উৎসভেদে সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে।


লেখক
Mishu Afrin Juthi Mishu Afrin Juthi studied Economics where her research interests centered on the historical relationship between trade policy and state formation in South Asia. She writes at the intersection of economic history and contemporary policy, tracing how ideas from Smith, Ricardo, and Keynes resurface often distorted in modern development debates. Her work for The Papyrus has examined Bangladesh's shifting position in global trade architecture, from BRICS accession debates to the political economy of regional connectivity projects like the Kyaukpyu corridor. She approaches economic journalism with a historian's skepticism of easy narratives, preferring to locate present-day policy choices within longer cycles of precedent and consequence. Dhaka, Bangladesh

Comments