জন মিয়ারশাইমার তাঁর "দ্য ট্র্যাজেডি অব গ্রেট পাওয়ার পলিটিক্স" বইয়ে যুক্তি দিয়েছিলেন যে নৈরাজ্যিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ছোট রাষ্ট্রগুলোর হাতে খুব সীমিত পছন্দ থাকে। তারা সত্যিকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে না বেশিদিন, কারণ প্রতিটি বড় প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত অনিবার্যভাবে তাদের কোনো না কোনো শক্তিকেন্দ্রের কক্ষপথে টেনে নেয়। অস্ত্র মানেই শুধু হার্ডওয়্যার নয়, তার সাথে আসে যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ, সফটওয়্যার আপডেট আর কূটনৈতিক ঋণের এক দীর্ঘস্থায়ী শৃঙ্খল। বাংলাদেশের সামনে এখন ঠিক এই বাস্তবতা। একটি যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত, যা আসলে অনেক বড় একটি প্রশ্নের ছদ্মবেশ।
২০২৬ সালের মে মাসে একটি পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সি-১৩০ জে বিমান নীরবে ঢাকায় অবতরণ করে, ভেতরে একটি মাত্র ভারী ক্রেট। সেই ক্রেটের ভেতরে ছিলো একটি পূর্ণাঙ্গ জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক থ্রি কমব্যাট সিমুলেটর। ১৯৭১ সালের পর এই প্রথম কোনো পাকিস্তানি সামরিক বিমান-সরঞ্জাম বাংলাদেশের মাটিতে প্রবেশ করলো। দুই দেশের বিমান বাহিনীর মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক "এয়ার স্টাফ টকস" এর সময় এই সিমুলেটর হস্তান্তর করা হয় এবং একে একটি প্রশিক্ষণ যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সম্ভাব্য ষোলো থেকে আটচল্লিশটি জেএফ-১৭ ব্লক থ্রি মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের প্রস্তুতি হিসেবে, যার আনুমানিক মূল্য চারশো থেকে সাতশো বিশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের একটি প্রতিবেদনে এই ঘটনাকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়েছে এবং সতর্ক করা হয়েছে যে এত বড় মাত্রার একটি সিদ্ধান্ত, যার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান, রাজস্ব সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের উপর পড়বে, তা কঠোর সংসদীয় পর্যালোচনা, স্বাধীন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং প্রকাশ্য জনআলোচনার দাবি রাখে।
অপারেশনাল যুক্তি বনাম কৌশলগত ঝুঁকি
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হাতে বর্তমানে মাত্র চুয়াল্লিশটি যুদ্ধবিমান আছে, যার মধ্যে ছত্রিশটি পুরনো এফ-৭ এবং বাকি আটটি মিগ-২৯। উভয়ই তাদের কার্যকর সেবাজীবনের শেষ প্রান্তে। "ফোর্সেস গোল ২০৩০" আধুনিকীকরণ পরিকল্পনার আওতায় একটি বিশ্বাসযোগ্য বিমান শক্তি গড়ে তোলা তাই একটি বাস্তব অপারেশনাল প্রয়োজন। এই যুক্তিতে কোনো ভুল নেই। কিন্তু সমালোচকদের মূল আপত্তি অন্যত্র। তারা বলছেন, এই আলোচনা শুধু প্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে, অথচ উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে এই সংগ্রহের রাজনৈতিক অভিমুখ, দীর্ঘমেয়াদী রাজস্ব বোঝা এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার এই সময়ে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ভবিষ্যৎকে একটি চীন-পাকিস্তান সরবরাহ শৃঙ্খলের সাথে বেঁধে ফেলার কৌশলগত পরিণতি। একটি যুদ্ধবিমান কখনোই শুধু একটি অস্ত্র-প্ল্যাটফর্ম নয়। এটি একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, একটি অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা-নির্ভরতার নিরিখে এমন একটি জোটবদ্ধতার বিবৃতি, যা সরকার বদলের পরও টিকে থাকে।
তুলনামূলক চিত্রটি স্পষ্ট করে বলা দরকার। ভারতীয় বিমান বাহিনীর হাতে ঊনত্রিশটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন আছে এবং প্রতি স্কোয়াড্রনে আঠারোটি করে হিসাব করলে তাদের সম্মুখসারির যুদ্ধবিমানের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় পাঁচশো বাইশটি। রাফাল, সুখোই এসইউ-৩০ এমকেআই এবং দেশীয় তেজস সহ। অর্থাৎ আটচল্লিশটি জেএফ-১৭ যুক্ত হলেও তা ভারতের সামগ্রিক বিমান শ্রেষ্ঠত্বকে উল্টে দেবে না, কিন্তু সক্ষমতার ব্যবধান কিছুটা সংকুচিত করবে এবং ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলবে । বিশেষত শিলিগুড়ি করিডোরের মতো স্পর্শকাতর এলাকা নিয়ে, যে সরু ভূখণ্ড ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সাথে সংযুক্ত রাখে।
বিতর্কিত দাবিঃ অপারেশন সিন্দুর, মে ২০২৫
ভারতের ভাষ্য
ভারতীয় বিমান বাহিনী প্রধান এ.পি. সিং অক্টোবর ২০২৫-এ জানান, বারো থেকে তেরোটি পাকিস্তানি বিমান ধ্বংস করা হয়েছে, যার মধ্যে চার থেকে পাঁচটি উচ্চ-প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান যার মধ্যে এফ-১৬ ও জেএফ-১৭ উভয়ই আছে। এস-৪০০ ব্যবস্থা একটি জেএফ-১৭ কে ভূপাতিত করার দাবি করেছে, যাকে ভারতীয় ইতিহাসের দীর্ঘতম-পাল্লার আকাশ-প্রতিরক্ষা "কিল" বলা হচ্ছে।
পাকিস্তানের ভাষ্য
পাকিস্তান ভারতের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা দাবি করে যে তাদের বাহিনী একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, যার মধ্যে একটি রাফাল একটি চীনা জে-১০সি থেকে ছোড়া পিএল-১৫ দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে এবং তা যদি সত্য হয়, তবে যুদ্ধক্ষেত্রে এই অস্ত্রের প্রথম প্রমাণিত ব্যবহার।
দুই পক্ষের দাবিই স্বাধীনভাবে সম্পূর্ণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং উভয় সরকারই নিজ নিজ বর্ণনায় অটল। তবে যে বিষয়টি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগস্ট ২০২৫-এ পাকিস্তানের এফ-১৬ ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত প্রশ্নে সরাসরি মন্তব্য এড়িয়ে যায়। একটি লক্ষণীয় নীরবতা, যা ২০১৯ সালের অনুরূপ ঘটনার সময়কার যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার তুলনায় ভিন্ন সুরে বাজে। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত বিমান বাহিনী কর্মকর্তাদের একাংশ প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইউরেশিয়া রিভিউতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে নাম-প্রকাশে-অনিচ্ছুক একজন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডোর মন্তব্য করেন যে অপারেশন সিন্দুরে জেএফ-১৭ ভারতীয় নির্ভুল আক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয়েছিলো। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। জেএফ -১৭ কয়েকটি মানে কমপক্ষে ২-৪টি রাফাল যুদ্ধ বিমান ভূপাতিত করেছে।
বিক্রেতা কারা, এবং কে লাভবান হচ্ছে
জেএফ-১৭ একটি চীন-পাকিস্তান যৌথ পণ্য। পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স এবং চীনের চেংডু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশনের যৌথ উৎপাদন, মূলত পশ্চিমা সরবরাহকারীদের উপর পাকিস্তানের নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে তৈরি। ঢাকায় নিযুক্ত অত্যন্ত সক্রিয় চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সামরিক শীর্ষ নেতৃত্ব সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনী প্রধানদের সহ এই চুক্তির পক্ষে সমর্থন আদায়ে সক্রিয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্বগ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফর নির্ধারিত হয়েছিলো চীনে এবং সেই সফরকে ঘিরেই জেএফ-১৭ চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার জল্পনা জোরালো হয়েছিলো। সমালোচকদের অভিযোগ, চীন বাংলাদেশের কাছে ত্রুটিপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করলেও প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে ঢাকার সাথে পুরোপুরি স্বচ্ছ থাকেনি এবং তাদের মূল আগ্রহ বিক্রয় বাড়ানোতেই সীমাবদ্ধ। জেএফ-১৭ এর নিরাপত্তা রেকর্ডও একটি পুনরাবৃত্ত উদ্বেগের বিষয়। এভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি নিশ্চিত দুর্ঘটনার নথি আছে, ২০১১, ২০১৬, ২০২০, ২০২১ এবং ২০২৪ সালে, যার মধ্যে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে নিরাপদ ইজেকশন পর্যন্ত বিভিন্ন পরিণতি আছে।
"একটি যুদ্ধবিমান কখনোই শুধু একটি অস্ত্র-প্ল্যাটফর্ম নয়। এটি এমন একটি কৌশলগত কক্ষপথে প্রবেশের সিদ্ধান্ত, যেখান থেকে প্রস্থান হবে কঠিন, ব্যয়বহুল এবং কূটনৈতিকভাবে ভারাক্রান্ত।"অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের সতর্কবার্তা
দিল্লি, বেইজিং এবং ওয়াশিংটনের ত্রিমুখী চাপ
ভারতের জন্য উদ্বেগের কেন্দ্রে আছে শুধু জেএফ-১৭ একা নয় বরং এটি বাংলাদেশ-চীন প্রতিরক্ষা সম্পর্কের একটি বৃহত্তর ধারার অংশ। ভারত-সীমান্তের কাছে একটি ড্রোন কারখানা নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি চীন-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তির কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মূল্যায়ন হলো, বাংলাদেশের অত্যাধুনিক চীনা সরঞ্জামের উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা। যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও সফটওয়্যার আপডেটের ক্ষেত্রে সময়ের সাথে চীনকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সংগ্রহ সিদ্ধান্তের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব দিতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রও নিষ্ক্রিয় নেই। প্রতিবেদন অনুযায়ী ওয়াশিংটন বাংলাদেশকে রকেট লঞ্চার, আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুদ্ধবিমান সংবলিত একটি বিকল্প প্রতিরক্ষা প্যাকেজের প্রস্তাব দিয়ে চীনা প্রভাব মোকাবিলার চেষ্টা করছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতা এবং ভারতের প্রভাব হ্রাসের সুযোগে চীন তার প্রভাব আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। যদিও বেইজিং রয়টার্সকে জানিয়েছে তাদের সহযোগিতা পারস্পরিক কল্যাণের জন্য, কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয় এবং তারা বহিরাগত হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না।
সোর্সিং নোট: সিমুলেটর হস্তান্তর ও সংগ্রহ পরিকল্পনার তথ্য Australian Institute of International Affairs-এর প্রতিবেদন, Asia Times ও South China Morning Post-এর সংবাদ থেকে যাচাই করা। অপারেশন সিন্দুর সংক্রান্ত ক্ষয়ক্ষতির দাবি ভারত ও পাকিস্তান উভয় পক্ষ থেকেই এসেছে এবং পরস্পরবিরোধী। তাই এই নিবন্ধে তা "বিতর্কিত দাবি" হিসেবে স্পষ্টভাবে পৃথক করে উপস্থাপন করা হয়েছে, নিশ্চিত সত্য হিসেবে নয়। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মন্তব্য বেনামী সূত্র থেকে এসেছে, যা একক-সূত্র প্রতিবেদিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
Papyrus Verdict
জেএফ-১৭ বিতর্কের প্রকৃত গুরুত্ব বিমানের প্রযুক্তিগত মান নিয়ে নয়। সেই বিতর্ক মীমাংসাহীনই থেকে যাবে, কারণ অপারেশন সিন্দুরের ক্ষয়ক্ষতির দাবি উভয় পক্ষের রাজনৈতিক আখ্যানের সাথে এতটাই জড়িয়ে গেছে যে স্বতন্ত্র যাচাই কার্যত অসম্ভব। প্রকৃত প্রশ্নটি কাঠামোগত। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বিদ্বেষ নয়"। এই নীতিতে বিশ্বাসী থেকেছে, কিন্তু একটি সাতশো বিশ মিলিয়ন ডলারের সিদ্ধান্ত, যা দশকের পর দশক ধরে যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি একক সরবরাহ শৃঙ্খলের সাথে বেঁধে দেবে, তা নিরপেক্ষতার সেই নীতির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা একটি ন্যায্য প্রশ্ন। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র তিন পক্ষই এই একটি সিদ্ধান্তের মধ্যে নিজ নিজ কৌশলগত স্বার্থ দেখছে, এবং এই ত্রিমুখী চাপই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ এখন নিছক একটি ক্রেতা নয়, বরং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক দাবার ছকের একটি সক্রিয় ঘুঁটি। মিয়ারশাইমারের ভাষায় বলা যায় নৈরাজ্যিক বিশ্বব্যবস্থায় সত্যিকারের নিরপেক্ষতা প্রায়শই একটি বিলাসিতা, যা ছোট রাষ্ট্রগুলোর সামর্থ্যের বাইরে চলে যায় ঠিক তখনই, যখন তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একটি স্বাধীন প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
Comments