One Palestine, Complete — Tom Segev
"তারা একই ভূমিতে বাস করত, কিন্তু দুটি ভিন্ন বাস্তবতায়।"
— টম সেগেভ, ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ
১৯১৭ সালের ডিসেম্বরে জেনারেল এডমন্ড অ্যালেনবি যখন পায়ে হেঁটে জেরুজালেমে প্রবেশ করলেন, তখন চার শতাব্দীর একটি শাসনব্যবস্থা কার্যত সমাপ্ত হয়ে গিয়েছিল। উসমানীয় সাম্রাজ্য ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছিল, আর তার ভগ্নাবশেষের উপর দাঁড়িয়ে ব্রিটেন এমন এক ভূরাজনৈতিক পরীক্ষা শুরু করতে যাচ্ছিল, যার পরিণতি একশ বছর পরেও শেষ হয়নি। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত বোঝার জন্য ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করা একটি সাধারণ ভুল। কারণ সেই বছরের সংঘাত আসলে আগের সাত দশকের রাজনৈতিক, জনতাত্ত্বিক ও আদর্শিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফলাফল মাত্র।
আমরা মূলত ১৫ টি পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন তৈরি করেছি ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনের দীর্ঘ সংগ্রাম নিয়ে। সিরিজের প্রথম পর্বে আমরা ফিরে যাচ্ছি উসমানীয় ফিলিস্তিনে যেখানে এই সংঘাতের বীজ রোপিত হয়েছিল, বহু আগে থেকেই।
অনেকেই হয়ত বলবে এই ভূমিতো ৪০০০ বছর অর্থাৎ মানব সভ্যতার শুরু থেকেই ছিল। তাহলে আমরা কেন উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে শুরু করলাম। উসমানীয় সাম্রাজ্যের আগের কাহিনী আমরা একেবারে শেসে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের আলোকে পর্যালোচনা করবো। সেখানে যেমন আল কুরআন থাকবে ঠিক তেমনি বাইবেল, ওল্ড টেস্টামেন্ট, জাবুর কিতাব, তালমুদ সবই থাকবে। কিন্তু সেটার জন্য আমাদের পুরো পর্বগুলো অনুসরণ করতে হবে।
উসমানীয় শাসনাধীন ফিলিস্তিন: একটি প্রান্তিক প্রদেশ
১৫১৬ সাল থেকে ফিলিস্তিন অঞ্চল উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, প্রায় চারশ বছর ধরে। এই দীর্ঘ সময়ে অঞ্চলটি একক প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে কখনও বিদ্যমান ছিল না। বরং এটি বিভক্ত ছিল একাধিক সানজাকে (প্রশাসনিক জেলা)। দামেস্ক, বৈরুত ও জেরুজালেম ভিলায়েতের অধীনে। ১৮৭২ সালে জেরুজালেম সানজাক একটি বিশেষ মর্যাদা পায় এবং সরাসরি ইস্তাম্বুলের অধীনে চলে যায়, মূলত এর ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে। ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম তিন ধর্মের কাছেই এই শহর পবিত্র।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে উসমানীয় সাম্রাজ্য যে তানজিমাত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে, তার প্রভাব ফিলিস্তিনেও পড়ে। ১৮৫৮ সালের অটোমান ভূমি আইন (Land Code) বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়। এই আইন জমির মালিকানা নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে, কর আদায় সহজ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এর একটি অপ্রত্যাশিত পরিণতি ছিল: বহু কৃষক তাদের ঐতিহ্যগতভাবে চাষ করা জমি সরকারি নথিভুক্তির ভয়ে (সামরিক বাধ্যবাধকতা ও কর এড়াতে) নিজের নামে নিবন্ধন করাননি, বরং শহুরে ধনী পরিবার বা অনুপস্থিত ভূস্বামীদের নামে করিয়েছিলেন। এই ব্যবস্থা পরবর্তীতে বিশ শতকের গোড়ায় জায়নবাদী ভূমি ক্রয়ের পথ সহজ করে দেয়। কারণ জমি কেনাবেচার লেনদেন হতো এই অনুপস্থিত মালিকদের সাথে, স্থানীয় চাষিদের সাথে নয়।
উনিশ শতকের শেষভাগে ফিলিস্তিনের জনসংখ্যা ছিল আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয় লাখ, যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল আরবি ভাষাভাষী মুসলিম যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য খ্রিস্টান আরব সংখ্যালঘু এবং একটি ক্ষুদ্র কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ইহুদি জনগোষ্ঠী। যাদের অধিকাংশই বাস করতেন জেরুজালেম, হেবরন, সাফেদ ও তিবেরিয়াসের মতো ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ শহরে। এই ইহুদি জনগোষ্ঠী, যাকে ইতিহাসবিদরা "ওল্ড ইশুভ" নামে অভিহিত করেন, মূলত ধর্মীয় অধ্যয়ন ও প্রার্থনার উদ্দেশ্যে বসবাসকারী একটি সম্প্রদায়যারা ঐতিহ্যগতভাবে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ ছিল না। তাদের জীবিকা মূলত নির্ভর করত "খালুকা" নামক একটি দাতব্য তহবিল ব্যবস্থার উপর, যা বিদেশে বসবাসরত ইহুদি সম্প্রদায়ের অনুদানে পরিচালিত হতো।
উসমানীয় প্রশাসনিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল মিলেত ব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায় (মুসলিম, খ্রিস্টান সম্প্রদায়সমূহ, ইহুদি) নিজস্ব ধর্মীয় নেতৃত্বের অধীনে ব্যক্তিগত আইন, বিবাহ, উত্তরাধিকার ও স্থানীয় বিচার পরিচালনার স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত। এই ব্যবস্থা সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সহাবস্থান নিশ্চিত করলেও, একই সাথে তাদের পৃথক পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে বিভক্ত রাখত। যা পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির যুগে বিচ্ছিন্নতাকে আরও গভীর করার একটি কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করে। এছাড়া ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সাথে উসমানীয় সাম্রাজ্যের "ক্যাপিচুলেশন" চুক্তির অধীনে বিদেশি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানসমূহ বিশেষ আইনি সুরক্ষা ভোগ করত, যা উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপীয় ইহুদি সংস্থাগুলোর জমি ক্রয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনাকে তুলনামূলকভাবে সহজ করে তুলেছিল।
অর্থনৈতিকভাবে উসমানীয় ফিলিস্তিন ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। জলপাই, সাইট্রাস ফল (বিশেষত জাফা কমলা, যা ইউরোপীয় বাজারে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিল), গম ও তুলা উৎপাদনই ছিল প্রধান অর্থনৈতিক কার্যক্রম। জাফা বন্দর ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয় এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে জেরুজালেম-জাফা রেলপথ (১৮৯২) নির্মাণ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সংযোগকে আরও সুদৃঢ় করে। এই অর্থনৈতিক আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়া একই সাথে নতুন ইহুদি অভিবাসী ও স্থানীয় আরব জনগোষ্ঠী উভয়ের জন্যই সুযোগ তৈরি করেছিল, কিন্তু ভূমি মালিকানার প্রশ্নে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতাও জন্ম দিয়েছিল।
বৈরুত ও দামেস্কের অনুপস্থিত ভূস্বামী পরিবার যেমন সুরসক পরিবার। এই পরিবারটি ১৮৫৮ সালের ভূমি আইনের সুযোগে বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নামে নিবন্ধিত করিয়েছিলেন, তারাই পরবর্তীতে জায়নবাদী তহবিল সংস্থার কাছে বৃহৎ আকারে জমি বিক্রি করেন। ১৯২০-এর দশকের আগেই এভাবে হাজার হাজার একর কৃষিজমি হাতবদল হয়, যার ফলে বহু ভাগচাষি কৃষক (ফেল্লাহিন) যাদের সাথে জমির কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি সম্পর্ক ছিল না, শুধু ঐতিহ্যগত ব্যবহারাধিকার ছিল এবং এরা উচ্ছেদের ঝুঁকিতে পড়েন। এই প্রক্রিয়াই পরবর্তী কয়েক দশকে গ্রামীণ আরব সমাজে ক্ষোভের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
জায়নবাদের জন্ম: হার্ৎসল থেকে বাসেল কংগ্রেস
উনিশ শতকের ইউরোপে ইহুদি বিরোধী সহিংসতা বিশেষত রাশিয়ান সাম্রাজ্যে ১৮৮১ সালের পর্যায়ক্রমিক প্রোগ্রাম একটি নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম দেয়। এই পোগ্রমের প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয় "প্রথম আলিয়া" (১৮৮২–১৯০৩), যখন প্রায় ৩৫,০০০ ইহুদি অভিবাসী, প্রধানত পূর্ব ইউরোপ থেকে, ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করেন। এরা প্রতিষ্ঠা করেন রিশন লে-জিয়ন ও জিখরন ইয়াকভের মতো প্রথম দিককার কৃষি উপনিবেশ।
কিন্তু জায়নবাদকে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করেন ভিয়েনা-ভিত্তিক সাংবাদিক থিওডর হার্ৎসল। ১৮৯৪-৯৫ সালে প্যারিসে ড্রেফুস মামলা কভার করার সময় একজন ইহুদি ফরাসি সেনা কর্মকর্তাকে মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং জনতা "ইহুদিদের মৃত্যু হোক" স্লোগান দিয়েছিল হার্ৎসল সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে ইউরোপে ইহুদিদের আত্তীকরণ কখনোই সম্পূর্ণ নিরাপত্তা দেবে না। ১৮৯৬ সালে তিনি প্রকাশ করেন "Der Judenstaat" (ইহুদি রাষ্ট্র), যেখানে তিনি যুক্তি দেন যে ইহুদি সমস্যার একমাত্র সমাধান একটি স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
১৮৯৭ সালের আগস্টে সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম জায়নবাদী কংগ্রেস, যেখানে ২০০ জনের বেশি প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়ার্ল্ড জায়নিস্ট অর্গানাইজেশন। কংগ্রেসের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট। "ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা সুরক্ষিত একটি স্বদেশ প্রতিষ্ঠা করা।" হার্ৎসল নিজেই তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে বাসেলে তিনি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। শুধু কেউ এখনও তা দেখেনি। কূটনৈতিকভাবে তিনি উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের কাছে ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতির জন্য চার্টার লাভের চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। সুলতান অটোমান সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানান।
হার্ৎসলের মৃত্যুর (১৯০৪) পর জায়নবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব ধীরে ধীরে ব্যবহারিক উপনিবেশায়নের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কূটনৈতিক চার্টারের অপেক্ষায় না থেকে সরাসরি জমি কেনা ও বসতি নির্মাণের কৌশল গ্রহণ করা হয়। এই লক্ষ্যে ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জিউইশ ন্যাশনাল ফান্ড, যার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনে জমি ক্রয় করে তা স্থায়ীভাবে ইহুদি জনগণের সম্মিলিত মালিকানায় রাখা। অর্থাৎ ক্রীত জমি ভবিষ্যতে পুনরায় বিক্রি করা যাবে না। ফরাসি ইহুদি ব্যাংকার ব্যারন এডমন্ড দ্য রথচাইল্ড এই সময়ে ব্যক্তিগতভাবে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেন প্রথম আলিয়ার কৃষি উপনিবেশগুলোকে টিকিয়ে রাখতে, যদিও তার পরিচালন পদ্ধতি উপনিবেশগুলোতে ফরাসি প্রশাসক নিয়োগ অনেক বসতি স্থাপনকারীর সাথে দ্বন্দ্বে জড়ায়।
"একটি ভূমিহীন জাতির জন্য একটি জনহীন ভূমি" — জায়নবাদী আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবহৃত এই স্লোগানটি বাস্তবতার সাথে ক্রমশই সাংঘর্ষিক হয়ে উঠবে।
দ্বিতীয় আলিয়া ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়ার সূচনা
১৯০৪ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে "দ্বিতীয় আলিয়া"র সময় আরও প্রায় ৪০,০০০ ইহুদি অভিবাসী ফিলিস্তিনে আসেন, যাদের অনেকেই সমাজতান্ত্রিক-জায়নবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। এই সময়েই প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম কিবুৎজ (দেগানিয়া, ১৯০৯) এবং তেল আবিব শহর (১৯০৯), যা পরিকল্পিতভাবে নির্মিত প্রথম আধুনিক ইহুদি শহর হিসেবে গড়ে ওঠে জাফার উত্তরে। এই সময়কালে "হিব্রু শ্রম" (আভোদা ইভরিত) নীতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে অর্থাৎ ইহুদি খামারে আরব শ্রমিকদের পরিবর্তে ইহুদি শ্রমিক নিয়োগের আদর্শগত অগ্রাধিকার যা স্থানীয় অর্থনীতিতে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করে।
দ্বিতীয় আলিয়ার অভিবাসীদের মধ্য থেকেই পরবর্তী ইসরায়েলি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বের একটি বড় অংশ উঠে আসে। ডেভিড বেন-গুরিয়ন ও ইৎজাক বেন-জভি উভয়েই এই তরঙ্গে পোল্যান্ড ও রাশিয়া থেকে আসেন। এই সময়ে গঠিত হয় পোয়ালে জিয়োন (শ্রমিক জায়নবাদী) দল এবং হাশোমের নামক প্রথম ইহুদি আত্মরক্ষা সংগঠন (১৯০৯), যা পূর্ববর্তী বেসরকারি প্রহরী ব্যবস্থার (হাশোমেরা) স্থলাভিষিক্ত হয়ে বসতিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করত এবং যা পরবর্তীতে হাগানাহ ও শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়। সংগঠিত সশস্ত্র কাঠামোর এই প্রাথমিক বিকাশ জায়নবাদী প্রকল্পকে নিছক একটি অভিবাসন আন্দোলন থেকে একটি রাষ্ট্র-নির্মাণ প্রকল্পে রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল।
ফিলিস্তিনি আরব সমাজ প্রথম দিকে ক্রমবর্ধমান ইহুদি অভিবাসনকে প্রধানত স্থানীয় সমস্যা হিসেবে দেখত। জমি বিক্রি, কৃষক উচ্ছেদ ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রশ্ন হিসেবে। একটি জাতীয়তাবাদী হুমকি হিসেবে ততটা নয়। কিন্তু ১৯০৮ সালে ইয়াং তুর্ক বিপ্লবের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আরব বুদ্ধিজীবী মহলে জায়নবাদ নিয়ে আলোচনা তীব্রতর হয়। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নাজিব আজৌরির মতো ব্যক্তিরা ১৯০৫ সালেই সতর্ক করেছিলেন যে আরব জাতীয়তাবাদ ও জায়নবাদ উভয়ই তখন সবে জন্ম নেওয়া আন্দোলন অনিবার্যভাবে সংঘর্ষে জড়াবে, কারণ উভয়েরই লক্ষ্য একই ভূখণ্ডের উপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা।
১৯১১ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে জাফা-ভিত্তিক সংবাদপত্র "ফিলাস্তিন" জায়নবাদী ভূমি ক্রয় ও অভিবাসনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে, যা আরব জনমতে জায়নবাদ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সময়ে উসমানীয় পার্লামেন্টে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিরা বিশেষত জেরুজালেমের প্রতিনিধি রুহি আল-খালিদি ও সাইদ আল-হুসাইনি জায়নবাদী ভূমি ক্রয়ের বিরুদ্ধে আইনি বিধিনিষেধের দাবি তোলেন। ১৯১৪ সালে উসমানীয় প্রশাসন প্রকৃতপক্ষে বিদেশি ইহুদিদের জমি ক্রয়ের উপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, যদিও তা প্রয়োগে ব্যাপক অসঙ্গতি ছিল এবং ঘুষ ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে প্রায়শই এড়িয়ে যাওয়া হতো। এই পর্যায়ে আরব প্রতিরোধ এখনও মূলত সাংবাদিকতা ও প্রশাসনিক আবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তখনো সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলন বা সশস্ত্র প্রতিরোধের রূপ নেয়নি, যা আসবে পরবর্তী দশকগুলোতে, ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে।
বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে: সাম্রাজ্যের পতন ও প্রতিশ্রুতির জাল
১৯১৪ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষ নিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ করলে ব্রিটেন মধ্যপ্রাচ্যে তার কৌশলগত অবস্থান সুসংহত করার জন্য একাধিক, পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতি দিতে শুরু করে। মক্কার শরিফ হুসেইনের সাথে ম্যাকমাহন-হুসেইন পত্রালাপে (১৯১৫-১৬) ব্রিটেন আরব নেতাদের উসমানীয় শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করার বিনিময়ে যুদ্ধোত্তর আরব স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয় যদিও ফিলিস্তিন এই প্রতিশ্রুতির আওতায় পড়ে কিনা তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও বিতর্ক রয়েছে। একই সময়ে, ১৯১৬ সালে গোপন সাইকস-পিকো চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুদ্ধোত্তর মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে ভাগ করে নেওয়ার পরিকল্পনা করে, যেখানে ফিলিস্তিনের জন্য প্রস্তাব করা হয় আন্তর্জাতিক প্রশাসন। আর ১৯১৭ সালে আসে বেলফোর ঘোষণা যা এই সিরিজের দ্বিতীয় পর্বের কেন্দ্রীয় বিষয়।
এই তিনটি প্রতিশ্রুতি একে অপরের সাথে আংশিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যুদ্ধকালীন ব্রিটিশ কূটনীতির একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নিদর্শন হয়ে দাঁড়ায়, যার পরিণতি আগামী দশকগুলোতে অঞ্চলটির রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি মূল কাঠামোগত কারণ হয়ে থাকবে।
১৯১৬ সালের জুনে শরিফ হুসেইন উসমানীয় শাসনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে "আরব বিদ্রোহ" ঘোষণা করেন, যাতে ব্রিটিশ সামরিক ও আর্থিক সহায়তা এবং তার পুত্র ফয়সালের নেতৃত্বে অনিয়মিত আরব বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষত হেজাজ রেলপথ ধ্বংস ও আকাবা দখলের অভিযানে, যেখানে ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টা টি. ই. লরেন্সের ("লরেন্স অব অ্যারাবিয়া") সংশ্লিষ্টতা পরবর্তীতে পশ্চিমা জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। আরব বিদ্রোহের নেতারা বিশ্বাস করেছিলেন যে যুদ্ধ শেষে তারা একটি একীভূত আরব রাজ্য পাবেন, যার মধ্যে ফিলিস্তিনও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে তাদের ধারণা ছিল যদিও লন্ডনে একই সময়ে জায়নবাদী নেতাদের সাথে ভিন্ন প্রকৃতির আলোচনা চলছিল, যার পরিণতি হবে বেলফোর ঘোষণা।
১৯১৭ সালের ডিসেম্বরে জেনারেল অ্যালেনবির নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী জেরুজালেম দখল করে। উসমানীয় গভর্নরের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে, প্রায় বিনা রক্তপাতে, যা সমসাময়িক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে একটি "ক্রুসেড যুদ্ধের" প্রতীকী সমাপ্তি হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এরপর ১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে মেগিদ্দোর যুদ্ধে চূড়ান্ত পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এবং দামেস্কের পতনের সাথে ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় চার শতাব্দীর উসমানীয় শাসনের কার্যত অবসান ঘটে। এই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় ব্রিটিশ সামরিক প্রশাসন (OETA — Occupied Enemy Territory Administration), যা পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক ম্যান্ডেট ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হবে এবং যে প্রক্রিয়ায় ফয়সালের নেতৃত্বাধীন আরব প্রত্যাশা ও জায়নবাদী রাষ্ট্র-নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যকার অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেবে।
যে কাঠামো রয়ে গেল
উসমানীয় যুগের শেষে ফিলিস্তিনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা ছিল একটি বিস্ফোরক সমীকরণ: একদিকে একটি সংগঠিত, আদর্শগতভাবে চালিত অভিবাসী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যার আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল, অন্যদিকে একটি স্থানীয় আরব জনগোষ্ঠী যারা সবেমাত্র নিজেদের একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় হিসেবে বুঝতে শুরু করেছিল এবং তৃতীয়ত একটি সাম্রাজ্যিক শক্তি ব্রিটেন যে পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতির জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিল। ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার দুর্বলতা, ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা এবং একটি একক সুসংহত প্রশাসনিক সত্তার অনুপস্থিতি এই সবকিছু মিলিয়ে যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তার উপরই দাঁড়িয়ে থাকবে পরবর্তী তিন দশকের ব্রিটিশ ম্যান্ডেট, যেখানে এই সুপ্ত দ্বন্দ্বগুলো প্রকাশ্য সংঘাতে রূপান্তরিত হবে।
দুটি সমান্তরাল সমাজ
উসমানীয় শাসনের শেষ দশকগুলোতে যে বৈশিষ্ট্যটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হবে, তা হলো জায়নবাদী ইশুভ ও স্থানীয় আরব সমাজ একই ভূখণ্ডে বাস করলেও দুটি প্রায় সম্পূর্ণ পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক জগতে বিকশিত হচ্ছিল। ইশুভ গড়ে তুলছিল নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থা (হিব্রু ভাষাভিত্তিক), নিজস্ব শ্রমিক সংগঠন, নিজস্ব স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো (কুপাত হোলিম, ১৯১১) এবং নিজস্ব আধা-সামরিক সংগঠন যা কার্যত একটি রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র (state within a state) গঠনের প্রাথমিক রূপ ছিল। এলিয়েজার বেন-ইয়েহুদার নেতৃত্বে হিব্রু ভাষার পুনরুজ্জীবন এই সময়েই একটি সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক প্রকল্প হিসেবে বিকশিত হয়, যা ইশুভকে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় সত্তা হিসেবে সুসংহত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে ফিলিস্তিনি আরব সমাজ তখনও মূলত গ্রামভিত্তিক, প্রথাগত প্রভাবশালী পরিবারনির্ভর (আ'য়ান) রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সংগঠিত ছিল। জেরুজালেমের হুসাইনি ও নাশাশিবি পরিবারের মতো প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো স্থানীয় রাজনীতি ও উসমানীয় প্রশাসনের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করত। একটি সুসংহত, সর্বফিলিস্তিনি জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি যেমনটি জায়নবাদী আন্দোলনের ছিল বিশ্ব জায়নিস্ট অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে। পরবর্তী দশকগুলোতে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াকে তুলনামূলকভাবে বিক্ষিপ্ত ও প্রতিক্রিয়াশীল করে রাখবে, যেখানে জায়নবাদী আন্দোলন প্রতিটি পর্যায়ে অপেক্ষাকৃত সুসংগঠিত ও কৌশলগতভাবে অগ্রসর কূটনৈতিক অবস্থান নিতে সক্ষম হবে। এই কাঠামোগত অসামঞ্জস্য সাংগঠনিক সক্ষমতার এই ফারাক শুধু উসমানীয় যুগেই নয়, বরং ব্রিটিশ ম্যান্ডেট পর্বেও এই সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে একটি নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করবে, যা আমরা পরবর্তী পর্বে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করব।
দ্য পেপিরাস ভার্ডিক্ট
১৯৪৮ সালের যুদ্ধকে বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা হিসেবে দেখা মৌলিক বিশ্লেষণগত ভুল। উসমানীয় যুগের শেষ চার দশকেই তিনটি কাঠামোগত শর্ত স্থাপিত হয়ে গিয়েছিল যা পরবর্তী সংঘাতকে প্রায় অনিবার্য করে তুলেছিল — একটি রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত অভিবাসী আন্দোলন, একটি দুর্বল ভূমি মালিকানা ব্যবস্থা যা জনতাত্ত্বিক রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করেছিল, এবং একটি সাম্রাজ্যিক শক্তির পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতির উত্তরাধিকার। পরবর্তী পর্বগুলোতে আমরা দেখব কীভাবে এই কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট একটি অনিয়ন্ত্রণযোগ্য সংঘাতের জন্ম দেয়।
সূত্র নির্দেশিকা: এই প্রবন্ধের ঐতিহাসিক তথ্যাদি প্রতিষ্ঠিত ও ব্যাপকভাবে স্বীকৃত ইতিহাসগ্রন্থ (Tom Segev, Benny Morris, Rashid Khalidi) নির্ভর। জনসংখ্যা পরিসংখ্যান বিভিন্ন সমসাময়িক উসমানীয় ও ব্রিটিশ জনগণনার আনুমানিক হিসাব থেকে নেওয়া, যা উৎসভেদে সামান্য পরিবর্তিত হতে পারে।
Comments