ক্রিস মিলারের "চিপ ওয়ার" বইয়ের কেন্দ্রীয় যুক্তি ছিলো অনেকটা এই রকম; বিংশ শতাব্দীতে যেভাবে তেলের নিয়ন্ত্রণ বিশ্বশক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করেছিলো, একবিংশ শতাব্দীতে ঠিক সেই জায়গা নিয়েছে সেমিকন্ডাক্টর। যে দেশ সবচেয়ে উন্নত চিপ তৈরি করতে পারে বা তার নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, ভবিষ্যতের সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য তার হাতেই থাকবে। মিলারের এই থিসিসকে যুক্তরাষ্ট্র নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলো ২০২২ সালে। চার বছর পর, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠেছে সেই নীতি আদৌ কাজ করেছে কি?
২০২২ সালের ৭ অক্টোবর। বাইডেন প্রশাসনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটি একটি নতুন নিয়মাবলী জারি করলো, যা চীনের কাছে উন্নত লজিক চিপ, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট এবং সেমিকন্ডাক্টর তৈরির যন্ত্রপাতি রপ্তানি সীমিত করে দিলো। এটি ছিলো যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় একক পদক্ষেপ। একটি রাষ্ট্র সরাসরি আরেকটি রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ভবিষ্যৎকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো, শুধু বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ দিয়ে, কোনো গুলি না চালিয়ে। উদ্দেশ্য ছিলো স্পষ্ট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত সর্বোচ্চ ক্ষমতার চিপ থেকে চীনকে দূরে রাখা, যাতে তারা সামরিক আধুনিকীকরণ এবং কৌশলগত এআই সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের ধারেকাছেও পৌঁছাতে না পারে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হলো। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে এই গল্পটি এমন এক মোড় নিয়েছে, যা ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের নিজেদের মধ্যেই বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
এক বছরে নিষেধাজ্ঞা, প্রত্যাহার, শুল্ক এবং আবার নিষেধাজ্ঞা
এনভিডিয়ার এইচ২০০ চিপকে ঘিরে গত বারো মাসে যা ঘটেছে, তা সেমিকন্ডাক্টর নীতির ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল অধ্যায়গুলোর একটি। ট্রাম্প প্রশাসন প্রথমে এইচ২০০ রপ্তানি নিষিদ্ধ করলো, তারপর সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলো, এরপর ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইনের ২৩২ ধারার অধীনে একই ধরনের উচ্চ-ক্ষমতার চিপের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলো, এবং শেষে একটি বার্ষিক লাইসেন্সিং কাঠামো তৈরি করলো — যাকে শিল্প বিশেষজ্ঞরা সরাসরি "স্ববিরোধী" বলে অভিহিত করেছেন। একই বছরে চারটি ভিন্ন সিদ্ধান্ত, প্রতিটি আগেরটির সাথে সাংঘর্ষিক।
এই বিশৃঙ্খলার পেছনে রয়েছে ওয়াশিংটনের ভেতরকার একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই। কংগ্রেসের হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান ব্রায়ান ম্যাস্ট ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি "এআই ওভারওয়াচ অ্যাক্ট" কমিটির মধ্য দিয়ে পাস করিয়ে নিলেন একটি বিল যা এআই চিপ রপ্তানি লাইসেন্সের উপর কংগ্রেসকে ভেটো ক্ষমতা দিতে চায়, যে ক্ষমতা এখন একচেটিয়াভাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে। হাউস সিলেক্ট কমিটি অন চায়নার চেয়ারম্যান জন মুলেনার একাধিক চিঠি লিখেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিককে, এইচ২০০ রপ্তানির বিরোধিতা করে এবং উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন যন্ত্রপাতির উপর আরও কড়াকড়ির দাবি জানিয়ে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আটজন দ্বিদলীয় আইনপ্রণেতা লুটনিক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে যৌথ চিঠিতে দাবি করলেন যে শুধু নির্দিষ্ট কালোতালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের বদলে গোটা চীনের উপর সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন যন্ত্রপাতি রপ্তানির সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন। তাদের যুক্তি ছিলো নিরেট। প্রতিষ্ঠান-ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ হয়েছে, কারণ একবার যন্ত্র চীনের সীমান্ত পেরিয়ে গেলে তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের হাতে আর থাকে না। তাদের চিঠিতে একটি লাইন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি চোকপয়েন্ট যন্ত্র যা চীনে প্রবেশ করে, তা আমেরিকার কৌশলগত সুবিধার একটি স্থায়ী ক্ষতি বহন করে।
"প্রতিষ্ঠান-ভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা বেইজিং সহজেই এড়িয়ে যায় ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে" এই স্বীকারোক্তি এখন খোদ ওয়াশিংটনের নিজের আইনপ্রণেতাদের মুখেই।দ্বাদশ বছরের ব্যর্থতার হিসাব
এই ফাঁকফোকরের সবচেয়ে বড় প্রমাণ ডাচ কোম্পানি এএসএমএল এর লিথোগ্রাফি যন্ত্রের বিক্রয় সংখ্যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনে এএসএমএল-এর উন্নত লিথোগ্রাফি যন্ত্রের বিক্রি ২০২২ থেকে ২০২৩ সালে দ্বিগুণ হয়েছে এবং ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালে আবারও দ্বিগুণ হয়েছে। অর্থাৎ যে সময়টায় যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে জোরে নিষেধাজ্ঞার ঢোল বাজিয়েছে, ঠিক সেই সময়েই তার মিত্র দেশের প্রযুক্তি চীনের কারখানায় দ্বিগুণ গতিতে প্রবেশ করেছে। এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৬ সালের এপ্রিলে সিনেটর পিট রিকেটস উত্থাপন করলেন "ম্যাচ অ্যাক্ট" যা এসএমআইসি, সিএক্সএমটি, ওয়াইএমটিসি, হুয়া হং এবং হুয়াওয়েকে সীমাবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করবে এবং চীনের যেকোনো স্থাপনায় ডিপ আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি যন্ত্র বিক্রি নিষিদ্ধ করবে। ২০১৪ সালে চীনের প্রকাশিত জাতীয় সমন্বিত সার্কিট শিল্প উন্নয়ন নির্দেশিকা থেকে শুরু করে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর স্বনির্ভরতার লক্ষ্য নির্ধারণ করে পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলারের একটি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ তহবিল গঠন করা হয়েছিলো সেই থেকে ম্যাচ অ্যাক্ট পর্যন্ত। এটি চীনের সেমিকন্ডাক্টর উচ্চাকাঙ্ক্ষা থামানোর সপ্তম বড় প্রচেষ্টা। প্রতিটি প্রচেষ্টার পরও চীনের চিপ উৎপাদন যন্ত্রপাতি আমদানি প্রতি বছর বেড়েছে।
হুয়াওয়ের জবাব: পারফরম্যান্স নয়, পরিমাণে যুদ্ধ
এই পুরো নাটকের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে একটি বাস্তব সংখ্যা। এনভিডিয়া একসময় চীনের এআই চিপ বাজারের নব্বই শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করতো। ২০২৬ সালের শুরুতে সেই হিস্যা নেমে এসেছে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশে। এই পতনের পেছনে তিনটি শক্তি কাজ করেছে। পঁচিশ শতাংশ শুল্ক, বেইজিংয়ের "স্থানীয় কেনো" নির্দেশনা এবং সম্ভাব্য এআই ওভারওয়াচ অ্যাক্ট। হুয়াওয়ে এই ফাঁকা জায়গা পূরণ করার জন্য যে গতিতে এগোচ্ছে, তা নিছক ঘোষণা নয়। ২০২৬ সালে তাদের লক্ষ্য অ্যাসেন্ড ৯১০সি চিপের প্রায় ছয় লাখ ইউনিট উৎপাদন করা যা ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। সামগ্রিক অ্যাসেন্ড সিরিজ মিলিয়ে সংখ্যাটা ষোলো লাখ ডাই পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
এসএমআইসি এখানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। একটি সাধারণ বাণিজ্যিক ফাউন্ড্রি থেকে তারা এখন চীনের কৌশলগত এআই হার্ডওয়্যার উৎপাদনের জাতীয় চ্যাম্পিয়নে রূপান্তরিত হয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাদের মনোযোগ ছিলো মৌলিক উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে, যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ শেনজেনে ২.৩৫ বিলিয়ন ডলারের একটি কারখানা। এই সময়ে তারা ডিপ আল্ট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি ব্যবহার করে সাত ন্যানোমিটার প্রক্রিয়া তৈরিতে সফল হয়, যার প্রথম বাণিজ্যিক প্রমাণ ছিলো ২০২৩ সালে হুয়াওয়ের কিরিন ৯০০০এস চিপ। ২০২৫-২০২৬ সালে তাদের কৌশল সরাসরি এআই চিপ উৎপাদনের দিকে সরে গেছে। অ্যাসেন্ড ৯১০বি চিপের ব্যাপক উৎপাদন এবং সাত ন্যানোমিটার সক্ষমতা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা। এমনকি পাঁচ ন্যানোমিটার প্রক্রিয়ায় পাইলট উৎপাদনও শুরু হয়েছে, যদিও এই সাত ন্যানোমিটার প্রক্রিয়ার ফলন হার এখনো মাত্র বিশ থেকে চল্লিশ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যা আমাদের বোঝায় বাণিজ্যিক পরিপক্বতা এখনো অনেক দূরের পথ।
তবে এই অগ্রগতির পেছনে একটি অস্বস্তিকর ইতিহাসও আছে। টেকইনসাইটসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হুয়াওয়ের পরীক্ষিত প্রায় প্রতিটি অ্যাসেন্ড ৯১০বি এবং ৯১০সি চিপের ডাই আসলে তৈরি হয়েছিলো এসএমআইসিতে নয়, বরং তাইওয়ানের টিএসএমসি-র সাত ন্যানোমিটার কারখানায়। কেম্যান দ্বীপপুঞ্জে নিবন্ধিত সফগো নামের একটি চিপ ডিজাইন কোম্পানির মাধ্যমে হুয়াওয়ে প্রায় ২৯ লাখ টিএসএমসি ডাই সংগ্রহ করেছিলো যাকে মার্কিন কর্তৃপক্ষ নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি পরিকল্পিত প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করে টিএসএমসি-কে এক বিলিয়ন ডলার জরিমানা করে। ২০২৬ সালের শুরুতে এই "ডাই ব্যাংক" কার্যত শেষ হয়ে গেছে অর্থাৎ হুয়াওয়ের ভবিষ্যৎ অ্যাসেন্ড উৎপাদন এখন সম্পূর্ণভাবে এসএমআইসি-র নিজস্ব ওয়েফারের উপর নির্ভরশীল।
বাধার নাম মেমোরি, ফাউন্ড্রি নয়
চীনের স্বনির্ভরতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা এখন লজিক চিপ নয়, বরং হাই-ব্যান্ডউইডথ মেমোরি বা এইচবিএম এআই চিপের সাথে যুক্ত জটিল মাল্টি-লেয়ার ডিআরএএম প্যাকেজ, যার জন্য বিশেষায়িত থ্রু-সিলিকন-ভায়া প্রযুক্তি প্রয়োজন, যা চীনের মেমোরি নির্মাতাদের কাছে এখনো নেই। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ের নির্দেশনা এবং তার আগে পশ্চিমা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়ার আগেই চীন প্রায় ১৩ মিলিয়ন এইচবিএম স্ট্যাক মজুদ করে ফেলেছিলো, যার বেশিরভাগ এসেছিলো স্যামসাং থেকে। এই মজুদই ২০২৪-২০২৫ সালে অ্যাসেন্ড উৎপাদন টিকিয়ে রেখেছিলো। এখন চীনের নিজস্ব সবচেয়ে বড় ডিআরএএম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সিএক্সএমটি ঘরোয়া এইচবিএম তৈরি করছে বটে, কিন্তু ২০২৬ সালে তাদের প্রক্ষেপিত উৎপাদন মাত্র প্রায় ২ মিলিয়ন স্ট্যাক যা দিয়ে সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিন লাখ অ্যাসেন্ড ৯১০সি-সমতুল্য প্যাকেজ তৈরি করা সম্ভব। অর্থাৎ এসএমআইসি-র ফাউন্ড্রি সক্ষমতা এখন বছরে দশ লাখেরও বেশি অ্যাসেন্ড ইউনিটের জন্য যথেষ্ট, কিন্তু বিদেশি এইচবিএম ছাড়া সেই সক্ষমতার একটা বড় অংশ ব্যবহারই হবে না। এই বাধা এতটাই তীক্ষ্ণ যে, বিদেশি মেমোরি ছাড়া হুয়াওয়ে আগামী বছর দশ লাখ অ্যাসেন্ড চিপও তৈরি করতে পারবে না বলে বিশ্লেষকরা হিসাব করছেন।
তবু এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অ্যাসেন্ড চিপ এখন চীনের এআই বাস্তুতন্ত্রের মেরুদণ্ড। ডিপসিকের সাম্প্রতিক ফ্ল্যাগশিপ মডেল ভি৪ পরিচালিত হচ্ছে অ্যাসেন্ড চিপের উপর ভিত্তি করেই। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, হুয়াওয়ে এখন একক চিপের পারফরম্যান্সে এনভিডিয়ার সাথে প্রতিযোগিতা করার বদলে সিস্টেম-স্তরের দক্ষতায় মনোযোগ দিচ্ছে ছোট ট্রানজিস্টরের উপর নির্ভর না করে, চিপের ভেতরে তথ্য চলাচলের গতি ও সংযোগের দূরত্ব কমিয়ে পারফরম্যান্স বাড়ানোর কৌশল। এটি একটি বাস্তববাদী পদ্ধতি যেখানে সর্বাধুনিক লিথোগ্রাফি সীমিত, সেখানে নির্মাণ কৌশলের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা। তবু বিশেষজ্ঞদের একটি সতর্কতা স্পষ্ট। হুয়াওয়ের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের চিপের ক্ষমতা নয়, বরং এনভিডিয়ার কুডা-র মতো একটি পরিণত সফটওয়্যার বাস্তুতন্ত্রের অনুপস্থিতি, যা বিশ্বব্যাপী ডেভেলপারদের কাছে এখনো অপরিহার্য একটি মান হয়ে আছে।
সোর্সিং নোট: এই প্রতিবেদনের নীতি-সংক্রান্ত তথ্য East Asia Forum, Morgan Lewis-এর আইনি বিশ্লেষণ এবং কংগ্রেসনাল রেকর্ড থেকে নিশ্চিত হওয়া তথ্য। উৎপাদন সংখ্যা ও সরবরাহ চেইন বিবরণ Bloomberg-এর সংবাদভিত্তিক প্রতিবেদন এবং SemiAnalysis ও SemiconductorX-এর শিল্প-বিশ্লেষণ থেকে নেওয়া প্রক্ষেপণ — এগুলোকে "রিপোর্টেড" স্তরের তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, চূড়ান্ত সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, কারণ হুয়াওয়ে বা এসএমআইসি কোনো পক্ষই তাদের প্রকৃত উৎপাদন সংখ্যা সরকারিভাবে প্রকাশ করে না।
বিশ্ব কি দুই সিলিকনে ভাগ হয়ে যাচ্ছে?
গত চার বছরের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিলো সহজ। রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কি চীনের এআই সক্ষমতা থামিয়ে দিতে পারবে? ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে উত্তরটা আর সরল নেই। যা শুরু হয়েছিলো একটি নির্দিষ্ট রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে, তা এখন রূপ নিয়েছে আরও অনেক বড় কিছুতে। একটি দ্বিধাবিভক্ত বৈশ্বিক চিপ বাস্তুতন্ত্রে, যেখানে দুই পক্ষই নিজস্ব সরবরাহ চেইন, নিজস্ব চিপ স্থাপত্য এবং ক্রমশ বেমানান এআই অবকাঠামো তৈরি করছে। এটি কোনো সাময়িক নীতিগত বিরোধ নয় এটি ছয়শো বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের একটি কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস, যার সিদ্ধান্তগুলো ২০৩৫ সাল পর্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নির্ধারণ করে দেবে।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই বিভাজনের অর্থ বিমূর্ত নয়। যে দেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার এবং সরকারি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে চীনা প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের উপর নির্ভরশীল, সেই দেশকে আগামী দশকে একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সিলিকন বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়া, অথবা উভয়ের সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যয়বহুল ও কূটনৈতিকভাবে জটিল পথ অনুসরণ করা। এআই অবকাঠামো, ক্লাউড কম্পিউটিং চুক্তি, এমনকি বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তার শর্তেও এই বিভাজনের ছায়া পড়তে শুরু করেছে। প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব, নিজস্ব তথ্য, নিজস্ব অবকাঠামো এবং নিজস্ব কম্পিউটিং সক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ যা একসময় শুধু বৃহৎ শক্তির আলোচ্য বিষয় ছিলো, তা এখন বাংলাদেশের মতো মধ্যম-আয়ের দেশগুলোর জন্যও একটি বাস্তব নীতিগত অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
Papyrus Verdict
চার বছরের নিষেধাজ্ঞা, চারবার নীতি পরিবর্তন, এবং কংগ্রেসের ভেতরে-বাইরে বিরামহীন লড়াইয়ের পরও একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ দিয়ে একটি রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থামিয়ে দেওয়া যায় না, বড়জোর তার গতি কিছুটা শ্লথ করা যায় এবং তার ব্যয় বাড়ানো যায়। হুয়াওয়ে ও এসএমআইসি এখনো এনভিডিয়ার সর্বোচ্চ পারফরম্যান্সের ধারেকাছে নেই, এবং এইচবিএম মেমোরির ঘাটতি তাদের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হয়েই থাকবে আগামী কয়েক বছর। কিন্তু বারো বছরের ইতিহাস — ২০১৪ সালের জাতীয় পরিকল্পনা থেকে ২০২৬ সালের ম্যাচ অ্যাক্ট পর্যন্ত সাতটি ব্যর্থ প্রচেষ্টার ইতিহাস — একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখায়। প্রতিটি নিষেধাজ্ঞার জবাবে চীন থেমে যায়নি, বরং একটি বিকল্প পথ তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা যখন কংগ্রেস বনাম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার নিয়ে নিজেদের মধ্যে লড়ছেন, তখন বেইজিং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় বিনিয়োগ করে চলেছে। এই লড়াইয়ের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে না শুধু কে দ্রুততর চিপ তৈরি করে — বরং কে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা সহ্য করার সামর্থ্য রাখে। সেই মাপকাঠিতে, ২০২৬ সালের চিত্রটি ওয়াশিংটনের পক্ষে ততটা স্বস্তিদায়ক নয়, যতটা ২০২২ সালে কল্পনা করা হয়েছিলো।
Comments