Geopolitics - Intelligence & Espionage

কিম ফিলবি: পশ্চিমের হৃদয়ে সোভিয়েত গুপ্তচর

১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে বেইরুতে একটি ডিনার পার্টিতে একটি আসন খালি পড়ে ছিলো। সেই আসনের মালিক আর কখনো ফিরে আসেননি। তিনি চলে গিয়েছিলেন মস্কোতে সোভিয়েত কার্গো জাহাজের অন্ধকার কেবিনে লুকিয়ে। আর তাঁর এই পলায়ন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হয়ে থেকে গেছে চিরকালের জন্য। সেই মানুষটির নাম হ্যারল্ড অ্যাড্রিয়ান রাসেল ফিলবি। পরিচিত নামে: কিম ফিলবি।ফিলবির গল্প শুধু একটি গুপ্তচরের গল্প নয়। এটি একটি যুগের গল্প যখন আদর্শ ছিলো অস্ত্রের চেয়েও ধারালো। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের গল্প যে প্রতিষ্ঠান নিজের বুকে সাপ পুষেছে তিন দশক ধরে এবং বুঝতে পারেনি। এবং এটি একটি মানুষের গল্প যিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি ইতিহাসের সঠিক দিকে আছেন, এবং এই বিশ্বাসের মূল্য অন্যরা দিয়েছিলো তাদের জীবন দিয়ে।

লেখক Admin
সময় ০২/০৮/২৬ ১৬:৩৭:০৪
Facebook LinkedIn X (Twitter) WhatsApp Share
সারাংশ

১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে বেইরুতে একটি ডিনার পার্টিতে একটি আসন খালি পড়ে ছিলো। সেই আসনের মালিক আর কখনো ফিরে আসেননি। তিনি চলে গিয়েছিলেন মস্কোতে সোভিয়েত কার্গো জাহাজের অন্ধকার কেবিনে লুকিয়ে। আর তাঁর এই পলায়ন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হয়ে থেকে গেছে চিরকালের জন্য। সেই মানুষটির নাম হ্যারল্ড অ্যাড্রিয়ান রাসেল ফিলবি। পরিচিত নামে: কিম ফিলবি।ফিলবির গল্প শুধু একটি গুপ্তচরের গল্প নয়। এটি একটি যুগের গল্প যখন আদর্শ ছিলো অস্ত্রের চেয়েও ধারালো। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের গল্প যে প্রতিষ্ঠান নিজের বুকে সাপ পুষেছে তিন দশক ধরে এবং বুঝতে পারেনি। এবং এটি একটি মানুষের গল্প যিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি ইতিহাসের সঠিক দিকে আছেন, এবং এই বিশ্বাসের মূল্য অন্যরা দিয়েছিলো তাদের জীবন দিয়ে।

The spy who betrays his country does not feel that he is betraying it. He feels that his country has betrayed him and that he is, at last, being loyal to something larger." ------ John le Carré, Tinker Tailor Soldier Spy (1974)


অধ্যায় ০১: একটি প্রশ্ন, একটি জীবন

১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাসে বেইরুতে একটি ডিনার পার্টিতে একটি আসন খালি পড়ে ছিলো। সেই আসনের মালিক আর কখনো ফিরে আসেননি। তিনি চলে গিয়েছিলেন মস্কোতে — সোভিয়েত কার্গো জাহাজের অন্ধকার কেবিনে লুকিয়ে। আর তাঁর এই পলায়ন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হয়ে থেকে গেছে চিরকালের জন্য। সেই মানুষটির নাম হ্যারল্ড অ্যাড্রিয়ান রাসেল ফিলবি। পরিচিত নামে: কিম ফিলবি।


ফিলবির গল্প শুধু একটি গুপ্তচরের গল্প নয়। এটি একটি যুগের গল্প যখন আদর্শ ছিলো অস্ত্রের চেয়েও ধারালো। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের গল্প যে প্রতিষ্ঠান নিজের বুকে সাপ পুষেছে তিন দশক ধরে এবং বুঝতে পারেনি। এবং এটি একটি মানুষের গল্প যিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি ইতিহাসের সঠিক দিকে আছেন, এবং এই বিশ্বাসের মূল্য অন্যরা দিয়েছিলো তাদের জীবন দিয়ে।


অধ্যায় ০২: কেমব্রিজের শিকড় থেকে আদর্শের বিষবৃক্ষ

১৯৩০ এর দশকের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে বুঝতে হলে সেই সময়ের বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিত বুঝতে হবে। মহামন্দার ধাক্কায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার সবচেয়ে গভীর সংকটে। ইউরোপের রাস্তায় ফ্যাসিবাদ মাথা তুলছে। জার্মানিতে হিটলার, ইতালিতে মুসোলিনি। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক চেহারা কেমব্রিজের তরুণ মেধাবীদের কাছে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সোভিয়েত কমিউনিজম অনেকের কাছে মনে হয়েছিলো মানবজাতির একমাত্র সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ।


সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা NKVD এই সুযোগটি অসাধারণ দক্ষতায় কাজে লাগিয়েছিলো। তারা কেমব্রিজে এমন ছাত্রদের চিহ্নিত করলো যারা একই সাথে তিনটি মানদণ্ড পূরণ করে: অসাধারণ মেধাবী, গভীরভাবে আদর্শবাদী, এবং ভবিষ্যতে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এই তিন মানদণ্ডে যারা এগিয়ে, তাদেরই টার্গেট করা হলো। অর্থের প্রলোভন নয়, বিশ্বাস দিয়ে রিক্রুটমেন্ট। এইভাবে জন্ম নিলো কেমব্রিজ ফাইভ। কিম ফিলবি, গাই বার্জেস, ডোনাল্ড ম্যাকলেন, অ্যান্থনি ব্লান্ট, এবং জন কেয়ার্নক্রস।


ফিলবির ক্ষেত্রে আদর্শবাদ ছিলো আরও গভীর এবং জটিল। তাঁর বাবা সেন্ট জন ফিলবি ছিলেন একজন বিখ্যাত আরবস্থান বিশেষজ্ঞ, যিনি শেষজীবনে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বিদ্রোহের এই জিন ছেলের মধ্যেও ছিলো। কিন্তু ছেলে তাকে নিয়ে গেলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। কেমব্রিজ থেকে বের হয়ে তিনি প্রথমে সাংবাদিক হিসেবে স্পেনের গৃহযুদ্ধ কভার করলেন ফ্রাঙ্কোর পক্ষে। সোভিয়েতদের নির্দেশে সাজানো কভার হিসেবে। এইভাবে তিনি প্রমাণ করলেন যে দীর্ঘমেয়াদী গোপনীয়তা বজায় রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব। এই প্রমাণের পুরস্কার হিসেবে ১৯৪০ সালে তাঁকে MI6 এ ঢোকানো হলো। এখানে মনে রাখা জরুরী যে, আদর্শের জন্য যে গুপ্তচর কাজ করে, সে চাপে ভাঙে না। কারণ সে মনে করে বিশ্বাসঘাতকতাটাই তার সত্যিকারের আনুগত্য।


অধ্যায় ০৩ঃ Section IX — শত্রুকে ধরার দায়িত্ব পেলো শত্রু

MI6 এ ফিলবির উত্থান ছিলো রকেটের গতিতে। মেধা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সম্পর্ক তৈরির অসাধারণ দক্ষতা সব মিলিয়ে তিনি দ্রুতই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে আস্থাভাজন মুখ হয়ে উঠলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ১৯৪৪ সালে তাঁকে দেওয়া হলো Section IX এর প্রধানের পদ। MI6 এর সেই বিভাগ যার কাজ সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা অপারেশন পরিচালনা করা এবং সোভিয়েত স্পাইদের চিহ্নিত ও নিষ্ক্রিয় করা।


ইতিহাসের এই বিদ্রুপটি একটু থেমে অনুভব করা দরকার। যে মানুষকে MI6 সোভিয়েত গুপ্তচর ধরার দায়িত্ব দিলো সে মানুষটি নিজেই একজন সোভিয়েত গুপ্তচর। প্রতিটি ব্রিটিশ এজেন্টের নাম যখন তাঁর টেবিলে আসতো, সেই নাম রাতের মধ্যে চলে যেতো মস্কোতে। যে সোভিয়েত ডিফেক্টর পশ্চিমে আসতে চাইছেন, তাঁর পরিচয় আগেভাগেই KGB জেনে যেতো। পশ্চিমের প্রতিটি পাল্টা-গোয়েন্দা পদক্ষেপ যেন আয়নায় দেখার মতো করে মস্কো দেখতে পেতো। এই সময়ে MI6 ভেতরে ভেতরে ফিলবিকে "C" পদের অর্থাৎ MI6 এর সর্বোচ্চ পদের জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করছিলো। একজন সোভিয়েত গুপ্তচর ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হতে পারতেন। এই সম্ভাবনাটি ভাবলে মাথা ঘোরে।


KGB আর্কাইভ তথ্য: ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আংশিক KGB আর্কাইভ প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে জানা যায়, ফিলবি তাঁর কর্মজীবনে কয়েক হাজার গোপন নথি সোভিয়েতদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্টিংয়ের সময় তাঁর পাঠানো তথ্যের পরিমাণ এতটাই বেশি ছিলো যে মস্কোতে বিশেষ দল নিয়োগ করতে হয়েছিলো শুধু তাঁর ফাইল প্রসেস করার জন্য।


অধ্যায় ০৪ঃ ওয়াশিংটন পোস্টিং তথা পশ্চিমা সভ্যতার কেন্দ্রে মস্কোর চোখ

১৯৪৯ সালে ব্রিটিশ সরকার ফিলবিকে পাঠালো ওয়াশিংটন ডিসিতে। পদ: MI6 এবং CIA এর মধ্যে সংযোগকারী লিয়াজোঁ অফিসার। এই পদটি ছিলো পশ্চিমা গোয়েন্দা কাঠামোর সবচেয়ে সংবেদনশীল অবস্থান। দুটি সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে তথ্যের প্রবাহের নিয়ন্ত্রক। ওয়াশিংটনে ফিলবির যোগাযোগ ছিলো সর্বোচ্চ স্তরে। CIA এর পরিচালকের সাথে নিয়মিত বৈঠক, FBI প্রধান জে. এডগার হুভারের সাথে সাপ্তাহিক সাক্ষাৎ, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতর, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ, এমনকি পরমাণু শক্তি কমিশনের সাথেও তাঁর সংযোগ ছিলো।


১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ মাত্র দুই বছর। কিন্তু এই দুই বছরে যে ক্ষতি হয়েছিলো, পশ্চিমা বিশ্ব তা দশকের পর দশক বহন করেছে। পরমাণু কর্মসূচির তথ্য, কোরিয়া যুদ্ধের সামরিক পরিকল্পনা, পশ্চিমা গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সম্পূর্ণ কাঠামো। প্রতিটি তথ্য মস্কোতে পৌঁছে যেতো। তবে ফিলবির সবচেয়ে বিধ্বংসী কাজটি ছিলো অপারেশনাল স্তরে।


১৯৪৯-৫০ সালে CIA ও MI6 মিলে পরিকল্পনা করলো Operation VALUABLE। লক্ষ্য ছিলো অ্যালবেনিয়ায় তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকারকে ভেতর থেকে অস্থিতিশীল করা এবং উৎখাত করা। এটি হতো পশ্চিমের প্রথম সক্রিয় কমিউনিস্ট রোলব্যাক অপারেশন। শত শত অ্যালবেনিয়ান গেরিলাকে গ্রিস ও ইতালিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। তাদের অস্ত্র দেওয়া হলো। রেডিও যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হলো। এবং দলে দলে তাদের অ্যালবেনিয়ায় পাঠানো শুরু হলো। প্রতিটি দল সীমান্ত অতিক্রম করার আগেই সোভিয়েত ও অ্যালবেনিয়ান নিরাপত্তা বাহিনী তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। কেউ ধরা পড়তো, কেউ গুলিতে মরতো, কেউ বিচারের নামে ফাঁসিতে ঝুলতো। তিন বছরে কয়েকশো মানুষের জীবন শেষ হলো। অপারেশন VALUABLE সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হলো।


ফিলবি পুরো পরিকল্পনাটি মস্কোকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। প্রতিটি দলের নাম, অনুপ্রবেশের পথ, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি, লক্ষ্যস্থল। এটা ছিলো কেবল গোয়েন্দা ব্যর্থতা নয়। এটা ছিলো মানুষের জীবন নিয়ে নিষ্ঠুর এক খেলা, যেখানে খেলোয়াড় জানতো তিনি কী করছেন।


প্রতিটি দল অ্যালবেনিয়ার মাটিতে পা দেওয়ার আগেই সোভিয়েত বাহিনী অপেক্ষায় থাকতো। অপারেশন VALUABLE ছিলো ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণপত্র।


অধ্যায় ০৫ঃ সন্দেহের ছায়া থেকে বারো বছরের নিঃশ্বাস চাপা জীবন

১৯৫১ সালে আমেরিকান সাইফার বিশেষজ্ঞরা Venona প্রকল্পের আওতায় সোভিয়েত কূটনৈতিক বার্তা ডিকোড করতে সফল হলেন। ডিকোড হওয়া বার্তা থেকে স্পষ্ট হলো ব্রিটিশ বিদেশ দফতরে "Homer" কোড নামে একজন সোভিয়েত সোর্স কাজ করছে। তদন্তে সন্দেহ ঘনীভূত হলো ডোনাল্ড ম্যাকলেনের ওপর। ফিলবিরই কেমব্রিজ কমরেড। ফিলবি বুঝলেন বিপদ আসছে। ম্যাকলেন ধরা পড়লে জিজ্ঞাসাবাদে কতটা টিকবেন, সেটা অনিশ্চিত। এবং ম্যাকলেন যদি ভাঙেন, ফিলবির নাম উঠে আসবেই।

ফিলবি তখন ওয়াশিংটনে তাঁর বাড়িতে থাকতেন। গাই বার্জেস কেমব্রিজ ফাইভের আরেক সদস্য। মস্কোকে অ্যালার্ট করার পর বার্জেস লন্ডনে ফিরে ম্যাকলেনকে সতর্ক করলেন। ১৯৫১ সালের মে মাসে ম্যাকলেন এবং বার্জেস দুজনেই মস্কোতে পালিয়ে গেলেন। এই পলায়ন ব্রিটিশ গোয়েন্দা জগতে ভূমিকম্পের মতো আঘাত করলো। সন্দেহের আঙুল উঠলো ফিলবির দিকে। কারণ বার্জেস তাঁর বাড়িতেই থাকতেন। CIA তাঁকে অবিশ্বস্ত ঘোষণা করলো। MI6 তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দিলো।


১৯৫২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তাঁকে নাম ধরে সন্দেহ করা হলো। ফিলবি একটি প্রেস কনফারেন্স ডাকলেন। সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত মুখে, পরিপাটি স্যুটে, কণ্ঠে কোনো কাঁপুনি ছাড়া তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করলেন। ব্রিটিশ ভদ্রলোকের নিখুঁত অভিনয়। অনেকেই বিশ্বাস করলেন। MI6 তাঁকে আবার নিয়োগ দিলো বেইরুতে, সাংবাদিকের কভারে। সেখান থেকেও তথ্য চলতে থাকলো মস্কোতে।


১৯৬১ সালে KGB এর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আনাতোলি গলিটসিন পশ্চিমে ডিফেক্ট করলেন। তিনি CIA কে জানালেন, ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থায় সোভিয়েতের সর্বোচ্চ সম্পদ এখনো সক্রিয়। তাঁর বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হলো যে সেই ব্যক্তি ফিলবি। ১৯৬২ সালের শেষ দিকে MI6 কর্মকর্তা নিকোলাস এলিয়ট বেইরুতে এলেন। এলিয়ট ছিলেন ফিলবির দশকের বন্ধু। বন্ধুত্বের সুরে কথা বলে তিনি ফিলবির কাছ থেকে একটি আংশিক স্বীকারোক্তি আদায় করলেন। MI6 ভাবলো তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনছে। কিন্তু ফিলবি সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু ভাবছিলেন।


অধ্যায় ০৬ঃ ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত পলায়ন

২৩ জানুয়ারি ১৯৬৩।সেই রাতের বর্ণনা দিয়েছেন ফিলবির স্ত্রী এলিওনর। ডিনার পার্টিতে তিনি একা গেলেন, ফিলবি বললেন একটু পরে আসবেন। তিনি আর আসেননি। পরের দিন সকালে বাড়িতে ফিরে এলিওনর দেখলেন তাঁর স্বামী নেই। কোনো চিঠি নেই। কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু একটি শূন্য ঘর এবং একটি জীবনের সব চিহ্ন রেখে যাওয়া মানুষের অনুপস্থিতি।


সেই রাতে বেইরুত বন্দর থেকে একটি সোভিয়েত কার্গো জাহাজ ছেড়েছিলো। KGB বছরের পর বছর ধরে এই পলায়নের পরিকল্পনা রেডি রেখেছিলো। যে মুহূর্তে সংকেত এলো, সবকিছু নিখুঁতভাবে কার্যকর হলো। ফিলবি স্ত্রী রেখে গেলেন। সন্তান রেখে গেলেন। বন্ধু রেখে গেলেন। ব্রিটিশ নাম রেখে গেলেন। মস্কোতে পৌঁছে তিনি পেলেন সোভিয়েত নাগরিকত্ব, KGB তে সিনিয়র অ্যাডভাইজরের পদ, একটি বাড়ি, একটি গাড়ি।


MI6 এবং CIA-র জন্য এটি ছিলো সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্ত। তিন দশক ধরে তারা একজন সোভিয়েত গুপ্তচরকে বুকে আগলে রেখেছিলো, তাকে সর্বোচ্চ গোপন তথ্যে প্রবেশাধিকার দিয়েছিলো এবং শেষ মুহূর্তে সে সবার চোখের সামনে হাত ফসকে বেরিয়ে গেলো।


অধ্যায় ০৭ঃ মস্কোর নির্বাসন জীবন

মস্কোতে ফিলবির জীবন ছিলো আপাতদৃষ্টিতে সম্মানজনক, কিন্তু ভেতরে গভীরভাবে শূন্য। রুশ ভাষা কখনো পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেননি। সোভিয়েত সমাজের নিয়মিত মানুষের সাথে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারতেন না। ব্রিটিশ পত্রিকার পুরনো সংখ্যা, স্কচ হুইস্কি, ক্রিকেটের স্কোরকার্ড এগুলোই ছিলো তাঁর নির্বাসিত জীবনের ছোট্ট আনন্দ। তিনি একাধিকবার স্বীকার করেছিলেন যে তিনি যে মুক্ত, ন্যায়সঙ্গত সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা মস্কোতে পাননি। কিন্তু বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। কারণ বিশ্বাস ছাড়া তাঁর পুরো জীবনটাই অর্থহীন হয়ে পড়তো।


১৯৮৮ সালে কিম ফিলবি মস্কোতে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর মাত্র তিন বছর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়। যে আদর্শের জন্য তিনি তিন দশক সংগ্রাম করেছিলেন, সেই আদর্শের রাষ্ট্র তাঁর কবর খোঁড়ার আগেই ইতিহাসের ধুলায় মিলিয়ে যেতে শুরু করেছিলো।


পাপিরাস ভার্ডিক্ট

কিম ফিলবির গল্প থেকে তিনটি সত্য উঠে আসে যা আজও প্রাসঙ্গিক।


প্রথমত, আদর্শবাদ। যত মহৎই হোক না কেন। যখন অন্ধ হয়, তখন সে যেকোনো অপরাধকে ন্যায্য করতে পারে। ফিলবি কয়েকশো মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিলেন মানবমুক্তির নামে। এই বিরোধাভাস ফ্যাসিবাদ, কমিউনিজম, ধর্মীয় মৌলবাদ। সব ধরনের অন্ধ আদর্শবাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।


দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠান কখনো নিজের উপর সন্দেহ করতে চায় না। MI6 তিন দশক ধরে ফিলবিকে বিশ্বাস করে গেছে কারণ তিনি তাদের নিজেদের মতোই দেখতে ছিলেন একই শ্রেণীর, একই শিক্ষার, একই আচরণের। এই আস্থার অন্ধত্বই ছিলো সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।


তৃতীয়ত, শীতল যুদ্ধ শেষ হয়েছে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসঘাতকতার কৌশল আজও বিদ্যমান রাষ্ট্রে, কর্পোরেশনে, আন্তর্জাতিক জোটে।

কিম ফিলবি শেষপর্যন্ত কোনো দেশের ছিলেন না। ব্রিটেন তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁর কাছে একটি বিশ্বাসের স্বপ্ন ছিলো, বাস্তবে যা ছিলো একটি ঠান্ডা, আমলাতান্ত্রিক নির্বাসন। তিনি একটি বিশ্বাসের জন্য সব দিয়েছিলেন এবং সেই বিশ্বাস তাঁকে পরিশেষে শূন্য হাতে রেখে গেছে। এটাই কিম ফিলবির আসল উত্তরাধিকার এবং সবচেয়ে কঠিন সতর্কবার্তা।

লেখক
Admin English Bio Dhaka, Bangladesh

Comments