Research and Analysis - Explained

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশল- ভূমিকা

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি স্ট্রাটেজি ( জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল) প্রকাশ করেছে। আমরা চেষ্টা করবো সেই নথির সম্পূর্ণ টা বাংলাতে কয়েক পর্বে প্রকাশ করতে। আজ ভূমিকা শিরোনামে কিছুটা প্রকাশ করা হলো।

লেখক Hosnain R. Sunny
সময় ১৬/১২/২৫ ১৭:৫৯:৪৪
Facebook LinkedIn X (Twitter) WhatsApp Share
সারাংশ

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি স্ট্রাটেজি ( জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল) প্রকাশ করেছে। আমরা চেষ্টা করবো সেই নথির সম্পূর্ণ টা বাংলাতে কয়েক পর্বে প্রকাশ করতে। আজ ভূমিকা শিরোনামে কিছুটা প্রকাশ করা হলো।

২০২৫ সালের যুক্তরাষ্ট্রে National Security Strategy (NSS) নথিটি মূলত একটি আদর্শগত ঘোষণাপত্র নয়; এটি একটি সুস্পষ্ট, সীমিত ও স্বার্থকেন্দ্রিক রাষ্ট্রকৌশলগত দলিল। এই নথিতে “American Strategy” বলতে যা বোঝানো হয়েছে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, যেখানে লক্ষ্য ও উপায়ের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা। এখানে শুরুতেই দাবি করা হয়েছে যে, Cold War–এর পরবর্তী তিন দশকে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত কোনো প্রকৃত স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করেনি; বরং অসংখ্য আদর্শিক আকাঙ্ক্ষা, মানবিক লক্ষ্য ও বৈশ্বিক দায়িত্বের তালিকা তৈরি করেছে, যেগুলোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত সামর্থ্য ও জনসমর্থনের কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। এই ভুল ধারণার ফলে আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি “সব জায়গায় উপস্থিত কিন্তু কোথাও কার্যকর নয়” এমন একটি অবস্থায় পড়ে আছে।


Cold War পরবর্তী আমেরিকান এলিট শ্রেণি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বৈশ্বিক আধিপত্য শুধু সম্ভবই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। এর ফলে এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি গড়ে ওঠে যেখানে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি সংকট, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আমেরিকার দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু অন্যান্য দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বা আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব তখনই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত, যখন সেগুলো সরাসরি আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি বা সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে। এই সীমারেখা না টানার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ, ব্যয়বহুল সামরিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছে, যার কোনো স্পষ্ট জাতীয় লাভ নেই।


এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করেছে। তথাকথিত “globalism” ও অবাধ বাণিজ্যের নামে শিল্প উৎপাদন বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে আমেরিকার মধ্যবিত্ত শ্রেণি সংকুচিত হয়েছে এবং জাতীয় শিল্পভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে, যেখানে মিত্র রাষ্ট্রগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আমেরিকার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এর ফলে মার্কিন করদাতাদের ওপর বোঝা বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এমন সব সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যা মূলত অন্য দেশের স্বার্থরক্ষার জন্য পরিচালিত হয়েছে। উপরন্তু, আন্তর্জাতিক ও ট্রান্সন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে আমেরিকার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।


এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৫ সালে National Security Strategy ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বকে একটি “necessary correction” হিসেবে উপস্থাপন করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি কোনো প্রচলিত আদর্শবাদী কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ নয়; বরং এটি ফলাফলনির্ভর, স্বার্থকেন্দ্রিক এবং প্রয়োজনে কঠোর হলেও দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত এড়াতে আগ্রহী। নথিটি বারবার জোর দিয়ে বলে যে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য বিশ্ব শাসন করা নয়, বরং নিজের শক্তি ও স্বার্থ সংরক্ষণ করা। এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে “America First”—যার অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তখনই গ্রহণযোগ্য যখন তা সরাসরি আমেরিকার জনগণ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার উপকারে আসে।


এই স্ট্র্যাটেজির আলোকে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমেই যা চায়, তা হলো নিজের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র হিসেবে দেখতে চায়, যার সরকার নাগরিকদের প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষা করবে এবং বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে এখানে জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ, মাদক ও মানবপাচার দমন এসবকে শুধু সামাজিক বা আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক শর্ত হিসেবে দেখা হয়েছে।


একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চায় এমন একটি সামরিক শক্তি, যা প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল এবং ভয় দেখানোর মতো সক্ষম। তবে এই সামরিক শক্তির উদ্দেশ্য যুদ্ধ শুরু করা নয়, বরং যুদ্ধ ঠেকানো। শক্তিশালী পারমাণবিক deterrence, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্রব্যবস্থা—সবই এই “peace through strength” ধারণার অংশ। সামরিক শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক শক্তির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া শক্তিশালী সামরিক বাহিনী সম্ভব নয় এবং শিল্পভিত্তি ছাড়া অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব টেকসই হয় না।


এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের কাছ থেকে যা চায়, তা কেবল রাজনৈতিক সমর্থন নয়, বরং একটি নতুন ধরনের বৈশ্বিক সম্পর্ক কাঠামো। পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে, এই অঞ্চল তার সরাসরি নিরাপত্তা বলয়ের অংশ, এবং এখানে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সামরিক বা কৌশলগত উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়। এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো চীনের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়িয়ে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা, একই সঙ্গে সমুদ্রপথ ও সরবরাহ শৃঙ্খল নিরাপদ রাখা। ইউরোপের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র চায় শক্তিশালী কিন্তু দায়িত্বশীল মিত্র, যারা নিজেদের প্রতিরক্ষা নিজেরা বহন করবে এবং আমেরিকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হবে না।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি আরও সংযত। এখানে লক্ষ্য হলো শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা, জ্বালানি ও সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখা এবং এমন সংঘাতে জড়িয়ে না পড়া, যেগুলো দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আফ্রিকার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একটি সাহায্যনির্ভর সম্পর্ক থেকে সরে এসে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যনির্ভর সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি কৌশলগত সম্পদের ওপর প্রভাব বজায় রাখা যায়।


সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি সীমিত কিন্তু দৃঢ় রাষ্ট্রকৌশলের দিকে এগোচ্ছে। এটি এমন একটি কৌশল, যেখানে নৈতিক ভাষা থাকলেও সিদ্ধান্তের ভিত্তি আদর্শ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ।কার্যত ঘোষণা করছে যে ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র আর “বিশ্বের তত্ত্বাবধায়ক” হতে চায় না; বরং একটি শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী ও নির্বাচনীভাবে সক্রিয় রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে চায়।

লেখক
Hosnain R. Sunny Graduated from The London School of Economics and Social Sciences (LSE) in Politics and Economics and a Professional Accountant with more than Twelve (12) Years of Industry Experience including Ernst and Young, Grant Thornton etc. He is the Managing Editor of Country's first Philosophical and Political Economy Magazine ''The Papyrus''. Dhaka, Bangladesh

Comments