দ্রুত বৈশ্বিক পতনের লক্ষণঃ কেন ভেঙে পড়ছে আধুনিক সমাজ?
তিনটি বড় তত্ত্ব, তিনটি সতর্কবার্তা, এবং টিকে থাকার নতুন চিন্তা
আজকের পৃথিবীকে যদি ঠান্ডা মাথায় দেখা যায় তাহলে একটি অস্বস্তিকর সত্য খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর তা হলো আধুনিক সভ্যতার ভেতরে গভীর ক্লান্তি জমে উঠছে। তরুণরা কাজ করছে কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে আশ্বস্ত নয়। ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়ার পরও তাদের বড় অংশ মনে করছে জীবন যেন শুরু হওয়ার আগেই ঋণ, অনিশ্চয়তা আর হতাশার ফাঁদে আটকে গেছে। বাড়ি কেনা এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, পরিবার গড়া বিলম্বিত হচ্ছে, সন্তান নেওয়ার প্রবণতা দ্রুত কমছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে অভিবাসনের ঢেউ সামাজিক কাঠামোকে নতুন চাপের মুখে ফেলছে, আর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের বিশ্বাস আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল। সব মিলিয়ে পৃথিবীর বহু উন্নত সমাজে এক ধরনের নীরব ভাঙন শুরু হয়েছে যা বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ভিতরে ভিতরে গভীর।
এই অবস্থাকে অনেকেই সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দা বা রাজনৈতিক ব্যর্থতা বলে ব্যাখ্যা করেন কিন্তু বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বড়। বিভিন্ন সময়ে তিনজন প্রভাবশালী চিন্তাবিদ এই ধরনের সভ্যতাগত সংকট নিয়ে যে বিশ্লেষণ দিয়েছেন তা আজ আবার নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। Thomas Piketty তার '' Capital in the 21st Century'' বইয়ে দেখিয়েছেন আধুনিক পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় অসুখ হলো সম্পদের ক্রমাগত কেন্দ্রীভবন। অর্থাৎ অর্থনীতি যত এগোয় ততই ধনীদের হাতে আরও বেশি সম্পদ জমা হয় এবং সাধারণ মানুষের শ্রম সেই ব্যবধান পূরণ করতে পারে না। মানুষ তখন বুঝতে শুরু করে কঠোর পরিশ্রম করেও সে সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারবে না যেখানে বসে থাকা পুঁজির মালিকরা খুব সহজে পৌঁছে যায়। ফলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে উৎপাদনমুখী না থেকে আর্থিক জল্পনা, সম্পত্তি, শেয়ার আর সুদনির্ভর ভাড়াভোগী কাঠামোয় পরিণত হয়। এতে কাজের প্রতি আস্থা কমে যায়। কারণ শ্রম আর উন্নতির নিশ্চয়তা দেয় না বরং পুঁজি দেয়। সমাজের তরুণ অংশ তখন বাস্তব সৃষ্টির চেয়ে দ্রুত অর্থ তৈরির কৌশলে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। এখান থেকেই শুরু হয় গভীর অর্থনৈতিক বিমুখতা।
অন্যদিকে ইতিহাসবিদ Peter Turchin বিষয়টিকে দেখেছেন ক্ষমতা ও মর্যাদার সংকট হিসেবে। তাঁর মতে সমাজ তখনই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে যখন উচ্চশিক্ষিত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং নেতৃত্ব প্রত্যাশী মানুষের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায় কিন্তু তাদের জন্য ক্ষমতার আসন, মর্যাদার স্থান এবং প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র সেই অনুপাতে বাড়ে না। তখন এক ধরনের “অভিজাত-শ্রেণির অতিরিক্ত উৎপাদন” ঘটে। আজকের পৃথিবীতে এটি খুব সহজে দেখা যায়। হাজার হাজার তরুণ সেরা ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে কিন্তু তারা যে সম্মান, যে সামাজিক অবস্থান বা যে সিদ্ধান্তগ্রহণের ভূমিকা আশা করে তা পাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ক্ষোভ জমছে। কারণ তারা বিশ্বাস করে সিস্টেম তাদের জন্য খোলা নয়। একই সময়ে পুরনো ক্ষমতাধর শ্রেণি নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া। ফলে সমাজের উপরের স্তরেই এক ধরনের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ তৈরি হয়। ইতিহাসে French Revolution থেকে শুরু করে Late Roman Republic civil conflicts অনেক বড় বিপর্যয়ের পেছনে এই জমে ওঠা অভিজাত দ্বন্দ্বের প্রভাব ছিল। টার্চিন মনে করেন, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক মেরুকরণ, বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ক্রোধ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাস একই সংকটের আধুনিক রূপ।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে দার্শনিক ব্যাখ্যাটি দিয়েছিলেন Oswald Spengler। তাঁর মতে, সভ্যতারও একটি জীবনচক্র আছে। একটি সমাজ প্রথমে মাটির কাছাকাছি থাকে যেখানে পরিশ্রম, পরিবার, বিশ্বাস, উৎপাদন ও সমষ্টিগত দায়িত্ববোধের উপর দাঁড়ায়। পরে তা নগরায়িত হয়, সমৃদ্ধ হয়, জ্ঞান ও বাণিজ্যে বিস্তৃত হয়। কিন্তু একসময় সেই সভ্যতা মহানগরকেন্দ্রিক, অতিরিক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনির্ভর ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। তখন মানুষ বাস্তব সৃষ্টির চেয়ে বিমূর্ত অর্জনে বেশি মনোযোগী হয়। পরিবার বোঝা মনে হয়, সন্তানকে ভবিষ্যৎ নয় বরং দায় হিসেবে দেখা হয়। আর ব্যক্তিগত আরাম ও ভোগ সামাজিক কর্তব্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে। বাইরে থেকে সমাজ তখন অত্যন্ত উন্নত দেখালেও ভেতরে ভেতরে তার প্রাণশক্তি শুকিয়ে যায়। স্পেংলারের ভাষায়, সভ্যতা তখন তার সৃজনশীল আত্মা হারাতে শুরু করে। আজ উন্নত বিশ্বে জন্মহার পতন, একাকীত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং জাতীয় পরিচয়ের সংকট সেই ক্লান্তিরই বহিঃপ্রকাশ।
এই তিনটি তত্ত্ব আলাদা জায়গা থেকে এলেও তারা এক জায়গায় এসে মিলে যায়। পিকেটি বলছেন অর্থনৈতিক বৈষম্য মানুষকে সিস্টেমবিমুখ করছে, টার্চিন বলছেন মর্যাদা ও ক্ষমতার সংকুচিত কাঠামো শিক্ষিত শ্রেণিকে বিদ্রোহী করে তুলছে, আর স্পেংলার বলছেন সভ্যতা নিজেই ভেতর থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ সংকটটি কেবল বাজারের নয়, কেবল রাজনীতির নয়, এটি সভ্যতার ভিত নড়ে যাওয়ার সংকট। মানুষ আর কাজকে মুক্তির পথ মনে করছে না, রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার প্রতীক মনে করছে না, পরিবারকে স্থায়ী আশ্রয় মনে করছে না, আর সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে না। এই চারটি বিশ্বাস যখন একসাথে দুর্বল হয়, তখন কোনো সমাজ বাইরে যতই চকচকে থাকুক, তার ভিতরে পতন শুরু হয়ে যায়।
এই অবস্থায় একটি সমাজকে বিচার করার জন্য তিনটি খুব সাধারণ কিন্তু কার্যকর মানদণ্ড ব্যবহার করা যায়ঃ শক্তি, উন্মুক্ততা এবং সংহতি। শক্তি মানে শুধু সামরিক শক্তি নয়। এর মানে হলো সমাজের মানুষ কতটা উৎপাদনশীল, তরুণরা কতটা কাজমুখী এবং শ্রমের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন। যে সমাজে মানুষ কাজকে সম্মানের জায়গা থেকে দেখে, দক্ষতা বাড়াতে চায় এবং বাস্তব উৎপাদনে যুক্ত থাকে, সে সমাজ এখনও জীবিত। কিন্তু যে সমাজে সবাই দ্রুত ধনী হওয়ার শর্টকাট খোঁজে, বাস্তব কাজ এড়াতে চায় এবং কাগুজে সম্পদের পেছনে দৌড়ায়, সেখানে পতনের বীজ বপন হয়ে গেছে। উন্মুক্ততা মানে হলো মেধা ও যোগ্যতার পথ খোলা আছে কি না। মানুষ কি তার কাজের জন্য পুরস্কৃত হয়, নাকি সম্পর্ক ও গোষ্ঠীই সব ঠিক করে? সেখানে সমালোচনার জায়গা আছে, নাকি সত্য বলাকে বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হয়? যে সমাজে মত প্রকাশ সংকুচিত হয়, সেখানে ভুল জমে জমে বিস্ফোরণে রূপ নেয়। আর সংহতি হলো মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসের মাত্রা। অপরিচিতকে সাহায্য করার মানসিকতা, সমাজের ভালোর জন্য আত্মত্যাগের প্রস্তুতি, জাতীয় সংকটে একসাথে দাঁড়ানোর ইচ্ছা। এই সংহতি ভেঙে গেলে রাষ্ট্র কাগজে থাকলেও সমাজ কার্যত ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায়।
সমস্যা হলো, বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ জাতি-রাষ্ট্র এই তিনটি ক্ষেত্রেই অবনতি দেখাচ্ছে। উৎপাদনশীলতার জায়গায় আসছে ক্লান্তি। উন্মুক্ততার জায়গায় আসছে গোষ্ঠীকেন্দ্রিকতা, সংহতির জায়গায় আসছে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিস্বার্থ। ফলে বড় বড় রাষ্ট্রও ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে তাই শুধু বড় অর্থনীতি বা বড় জনসংখ্যা দিয়ে টিকে থাকা যাবে না; টিকে থাকবে সেই সমাজ যেখানে মানুষের কাজের নৈতিকতা আছে, পারস্পরিক বিশ্বাস আছে এবং বাস্তব জীবনের স্থিতি আছে। হতে পারে সেসব সমাজ ছোট হবে, কম ধনী হবে, আরও স্থানীয় হবে; কিন্তু সেগুলো হবে বেশি সহনশীল।
এখানেই মূল প্রশ্ন আসে আমরা কি এই পতন ঠেকাতে পারব?
হয়তো পুরোপুরি না। কারণ ইতিহাসে কোনো সভ্যতাই চিরস্থায়ী ছিল না। কিন্তু আমরা প্রস্তুত হতে পারি। প্রথমত, নিজেদের সমাজকে আবেগ নয়, বাস্তবতার চোখে দেখতে হবে। তরুণরা কি কাজ করতে চায়? মেধা কি মূল্য পায়? পরিবার কি এখনও শক্তিশালী? মানুষ কি একে অপরকে বিশ্বাস করে? যদি উত্তর দুর্বল হয়, তাহলে বুঝতে হবে সংকট বাইরের নয়, ঘরের ভেতরেই ঢুকে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের নতুন করে টেকসই সমাজ নির্মাণের কথা ভাবতে হবে যেখানে থাকবে স্থানীয় উৎপাদন, পারিবারিক স্থিতি, দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি, সামাজিক সহযোগিতা এবং কম ভোগবাদী জীবনধারা। কারণ আগামী যুগে সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে না কেবল টাকা; সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে স্থায়িত্ব।
পৃথিবী হয়তো একদিনে ধ্বংস হবে না, কিন্তু পুরনো নিয়মে চলা পৃথিবী যে দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যখন বাহ্যিক সমৃদ্ধির আড়ালে সভ্যতার গভীর ক্লান্তি জমছে। এই বাস্তবতাকে যারা আগে বুঝবে, তারাই আগামী সময়ের জন্য নিজেদের নতুনভাবে গড়ে নিতে পারবে। ইতিহাসের প্রতিটি পতন যেমন একটি যুগের সমাপ্তি, তেমনি সেটি আরেকটি যুগের জন্মও। এখন প্রশ্ন একটাই আমরা কি শুধু পতন দেখব, নাকি নতুন নির্মাণের জন্য প্রস্তুতি নেব?
Comments