আধুনিক দর্শনের জনক মানুয়েল কান্ট আমাদের শিখিয়েছিলেন যে আমরা নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষক নই বরং বাস্তবতার সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। যখন আমরা বাস্তবতাকে উপলব্ধি করি, আমরা এটিকে এমনভাবে রূপান্তরিত করি যা আমাদের এটি প্রক্রিয়া করতে সাহায্য করে। অন্য কথায়, আমরা বাস্তবতাকে কল্পনা করি।
দান্তে আমাদের শিখিয়েছিলেন যে এটাই ছিল ঈশ্বরের আমাদের প্রতি চূড়ান্ত উপহার। কারণ আমাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল নিঃশর্ত। তাই আমাদের নিজস্ব বাস্তবতা তৈরির স্বাধীনতা রয়েছে। আমরা কী বেছে নিই তার জন্য তিনি কখনো আমাদের বিচার করবেন না।
একাধিক ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা এবং ক্ষমতাশালীদের কারসাজির ফলে আমরা নিজেদের জন্য এমন একটি নরক কল্পনা করেছি যাকে আমরা স্বর্গ বলি।
এর একটি উদাহরণ ঘনিষ্ঠভাবে দেখিঃ অর্থ বা মুদ্রা।
অর্থ কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য একটি চিন্তার পরীক্ষা করা যাক। ধরুন আমরা একটি ব্যাংক এবং আমরা দশ লক্ষ ডলার আমানত সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি। তারপর আমরা একজন উদ্যোক্তাকে রেস্তোরাঁ খুলতে দশ লক্ষ ডলার ঋণ দিই। এখন আমাদের কাছে কত টাকা আছে?
উত্তর হওয়া উচিত শূন্য, কিন্তু বাস্তবে এটি বিশ লক্ষ। সাধারন মানুষ জানে না যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর অর্থ মুদ্রণের ক্ষমতা রয়েছে। টাকার কার্লসনের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে জার্মান অর্থনীতিবিদ রিচার্ড ওয়ার্নার ব্যাখ্যা করেন যে ব্যাংকগুলো সবসময়ই এই ক্ষমতা রাখে।
শুরুতে ব্যাংকগুলো সোনা নিত এবং রসিদ দিত (যেকোনো সময় সোনা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি) যা ব্যবসায়ীদের মধ্যে লেনদেন হতো এবং কার্যত মুদ্রায় পরিণত হতো। ব্যাংকগুলো যখন অর্থ ধার দিত, তারা তাদের সোনার মজুদ হস্তান্তর করত না। সুবিধার খাতিরে, তারা পরিবর্তে রসিদ দিত। এভাবে অর্থ মুদ্রণ করত।
এই ব্যবস্থা বেশিরভাগ সময় ভালোভাবে কাজ করত, কিন্তু সবসময়ই হঠাৎ পতনের ঝুঁকি ছিল। যদি একসাথে অনেক মানুষ টাকা তুলতে আসত বা কোনো রাজা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হত ব্যাংকটি দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ত।
সময়ের সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকগুলো বুঝতে পারল যে তাদের সর্বোত্তম কৌশল হল একত্রিত হওয়া। সম্মিলিতভাবে তাদের স্থানীয় ব্যাংক সামলানোর জন্য বৈশ্বিক সম্পদ থাকত। এছাড়াও যদি কোনো রাজা ঋণ না মেটাত ব্যাংকিং কার্টেল প্রতিদ্বন্দ্বী সিংহাসন দাবিদারকে সমর্থন করতে পারত। এটিই ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড তৃতীয়ের পতনের কারণ হয়েছিল (যিনি ইতালীয় ব্যাংকিং কার্টেলকে ঋণ পরিশোধ করতে অস্বীকার করেছিলেন) এবং টিউডর রাজবংশের উত্থান ঘটেছিল। হেনরি সপ্তম তার কর আদায়কারীদের লেলিয়ে দিলেন ইতালীয়দের ফেরত দেওয়ার জন্য এবং তারপর তার পুত্র হেনরি অষ্টম জনগণের কাছে বৈধতা ও জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠার জন্য কর আদায়কারীদের শিরশ্ছেদ করলেন।
ব্যাংকাররা সর্বদা ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করে এবং রাজাদের উৎখাত করতে পারলেও তারা তা পছন্দ করত না। আদর্শ পরিস্থিতি হবে এই বেসরকারি ব্যাংকগুলো জাতি-রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়া যাতে "জনগণ" রাষ্ট্রের ঋণের চূড়ান্ত জামিনদার হয়। এটিই ১৬৯৪ সালে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড প্রতিষ্ঠার কারণ হয়েছিল। এটি ছিল একজন বিনিয়োগকারীর স্বপ্নের প্রকল্প। এটি ছিল একটি দ্বীপ দুর্গের সংসদ কর্তৃক সমর্থিত ও সুরক্ষিত একটি বেসরকারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডাচ সোনা (অত্যন্ত লাভজনক ইস্ট ইন্ডিয়া মশলা ব্যবসা থেকে সংগৃহীত) ইংল্যান্ডে ঢেলে পড়ল যা এটিকে তার মহাদেশীয় সকল প্রতিদ্বন্দ্বীকে (নেপোলিয়নসহ) পরাজিত করতে সক্ষম করল।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে বিস্তার করলো। কারণ ব্যাংক অব ইংল্যান্ড যেকোনো জায়গা থেকে সম্পদ শোষণ করে নিজের দেশে নিয়ে আসতে পারতো। ইংল্যান্ড এমন একটি ব্যবস্থার পথিকৃৎ হয়েছিল যেখানে স্থানীয় অভিজাতদের তাদের নিজস্ব জনগণকে শোষণ করতে এবং স্থানীয় সম্পদ লুট করতে সহায়তা করার জন্য সহযোগী করা হতো (ক্লাসিক উদাহরণ হল ভারত)। এই ব্যবস্থা আজও অব্যাহত রয়েছে এবং আমাদের বুঝতে সাহায্য করে কেন স্বাধীনতার কয়েক দশক পরেও দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার দেশগুলো এখনও অকার্যকারিতা ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।
তাহলে প্রশ্ন চলে আসে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অর্থ মুদ্রণ করতে পারে তাহলে কেন দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং ঋণ রয়েছে?
মূলধারার অর্থনীতিবিদরা আমাদের যা শেখান তা হল এটি সম্পদের স্বল্পতার কারণে এবং যারা এটি সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করতে পারে তাদের কাছে এটি বরাদ্দ করা হয়। ভিন্নমতের অর্থনীতিবিদ (যারা কেবল সৎ হন) রিচার্ড ওয়ার্নার এবং মাইকেল হাডসন যেমন ভালোভাবে ব্যাখ্যা করে আমাদের বোঝান যে এটা আসলে সত্য নয়। অর্থ শূন্য থেকে তৈরি করা যায় এবং সমাজ যদি চায় তাহলে দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং ঋণ একটি কম্পিউটার কীস্ট্রোকের মাধ্যমে মুছে ফেলা যায়।
আমরা এটি করি না কারণ অর্থ প্রথম এবং প্রধানত একটি বিভ্রম যা আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে প্রতারণা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে (এবং এভাবে প্রকৃত সম্পদ তৈরি করতে)। দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং ঋণ আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করার জন্য বিদ্যমান যে অর্থের প্রকৃত মূল্য রয়েছে যা আসলে সত্য নয়।
কিন্তু কখনো কখনো সিস্টেমে অতিরিক্ত সহজ অর্থ তৈরি করে যা মানুষকে অলস ও আত্মতুষ্ট করে তোলে। এই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একটি আর্থিক সংকট (শেয়ারবাজার ধস বা মন্দা) তৈরি করতে পারে যা সিস্টেম থেকে অতিরিক্ত অর্থ মুছে ফেলার জন্য। মাঝে মাঝে সিস্টেমে বিশ্বাসের সংকটের পর, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো একটি যুদ্ধ তৈরি করতে পারে (উদাহরণস্বরূপ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ) সম্পদ ধ্বংস করতে এবং জনসংখ্যা কমাতে যাতে মানুষ তাদের মনিবদের জন্য আবার কঠোর পরিশ্রম করতে উৎসাহিত হয়।
প্রকৃতঅর্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং একটি দাসত্বের ব্যবস্থা।
অনেকে বিশ্বাস করেন যে ডিজিটাল মুদ্রার অনিবার্যতা এবং অর্থনৈতিক পতনের জন্য প্রস্তুতি নিতে আমাদের সোনা বা বিটকয়েনে বিনিয়োগ করা উচিত। বাস্তবতা হল যে ব্যবস্থাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে যদি মানুষ অর্থের মূল্য প্রত্যাখ্যান করে তাহলে সমস্ত সামাজিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে। মৌলিক সেবাগুলো (পানি ও বিদ্যুৎ) আর সরবরাহ করা হবে না, পুলিশ কাজে যাবে না এবং হাসপাতালগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। কোনো বিকল্প পরিকল্পনা নেই, কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই এবং কোনো বিকল্প উপায় নেই। ব্যাংকাররা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে যেখানে যদি তারা তাদের ক্ষমতা হারায় তাহলে আমরা আমাদের সভ্যতা হারাবো।
আমরা কি আসলে সেই পথেই এগুচ্ছি?
Comments