বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে “গ্লোবাল সাউথ” কেবল একটি ভৌগোলিক বা অর্থনৈতিক ধারণা নয় বরং একটি রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিকল্প শক্তির প্রতীক হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে তিনটি রাষ্ট্র চীন, রাশিয়া এবং ইরান। এই তিন দেশের ক্রমবর্ধমান সংযোগ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এক মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে: এটি কি একটি নতুন শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক ব্লকের সূচনা নাকি কেবল একটি স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত সমঝোতা, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল?
গ্লোবাল সাউথ ধারণাটি ঐতিহাসিকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি একটি প্রতিরোধমূলক রাজনৈতিক অবস্থানে রূপ নিয়েছে যা দীর্ঘদিনের পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করতে চায়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ, ডলার-নির্ভর অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন। এসবই গ্লোবাল সাউথকে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। এই পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় চীন, রাশিয়া এবং ইরান নিজেদের অবস্থান এমনভাবে নির্ধারণ করছে যা তাদের পারস্পরিক স্বার্থের পাশাপাশি একটি বৃহত্তর বিকল্প কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়।
চীন, রাশিয়া এবং ইরানের সম্পর্কের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো এটি প্রচলিত অর্থে কোনো আনুষ্ঠানিক জোট নয়। NATO এর মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বা কঠোর সামরিক কাঠামো এখানে অনুপস্থিত। বরং এটি একটি শিথিল, নমনীয় এবং পরিস্থিতিনির্ভর সহযোগিতা যেখানে প্রতিটি দেশ নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। চীন মূলত অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে মনোযোগী, রাশিয়া নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধারে আগ্রহী, আর ইরান টিকে থাকা এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চায়। এই ভিন্ন লক্ষ্যগুলোই তাদের সম্পর্ককে জটিল এবং বহুমাত্রিক করে তোলে।
এই সংযোগের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং চাপ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার উপর আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের দীর্ঘদিনের অবরোধ এবং চীনের বিরুদ্ধে প্রযুক্তি ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাগুলো এই তিনটি রাষ্ট্রকে একে অপরের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে এককভাবে পশ্চিমা চাপ মোকাবিলা করা কঠিন। কিন্তু সমন্বিতভাবে বিকল্প অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পথ তৈরি করা সম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে ডি-ডলারাইজেশন বা ডলার নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সামনে এসেছে যা শুধু এই তিন দেশ নয় বরং গ্লোবাল সাউথের আরও অনেক দেশের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিকল্প বাণিজ্য করিডোর এবং সংযোগ স্থাপন। চীনের Belt and Road Initiative, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি এবং ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান। এই তিনটি উপাদান একত্রে একটি নতুন বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সম্ভাবনা তৈরি করছে। এই নেটওয়ার্ক পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত সমুদ্রপথ ও আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে চীন ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যা ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে যা তাদের অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে।
সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এই তিন দেশের মধ্যে একটি সীমিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় দেখা যাচ্ছে। ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি রাশিয়ার জন্য ইউক্রেন যুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে রাশিয়া ইরানকে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে। চীন সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িত না হলেও কৌশলগতভাবে এই সম্পর্ককে সমর্থন করছে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কূটনৈতিক ব্যাকআপ প্রদান করছে। তবে এই সহযোগিতা এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছেনি যা একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটের বৈশিষ্ট্য বহন করে।
এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো পারস্পরিক সন্দেহ এবং প্রতিযোগিতা। চীন ও রাশিয়া মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, আবার চীন একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে যা ইরানের জন্য একটি কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়। একইভাবে, ইরানও চীনের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হতে চায় না এবং নিজস্ব কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে আগ্রহী। এই বাস্তবতাগুলো প্রমাণ করে যে, তাদের সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক না কেন এটি একটি সীমাবদ্ধ ও হিসাবি সহযোগিতা।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি এই সম্পর্কের প্রকৃতি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বা ইরান সম্পর্কিত সংকটগুলোতে চীন সরাসরি নেতৃত্ব গ্রহণ না করে ব্যাকচ্যানেল কূটনীতি অনুসরণ করছে যাতে করে একদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় থাকে, অন্যদিকে পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সংঘাত এড়ানো যায়। রাশিয়াও একইভাবে পশ্চিমা চাপের মুখে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছে যদিও কৌশলগতভাবে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখছে। এই আচরণগুলো প্রমাণ করে যে, এই তিন দেশের মধ্যে সম্পর্কটি অত্যন্ত বাস্তববাদী এবং ঝুঁকি-নির্ভর।
গ্লোবাল সাউথের প্রেক্ষাপটে এই সংযোগের প্রভাবও গভীর। এটি অনেক উন্নয়নশীল দেশকে একটি বিকল্প পথ দেখাচ্ছে, যেখানে তারা পশ্চিমা শক্তির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করেও নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। BRICS এবং Shanghai Cooperation Organisation (SCO) এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করছে। এসব প্ল্যাটফর্ম গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করছে।
তবে এই সংযোগকে “নতুন ব্লক” হিসেবে চিহ্নিত করার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি প্রকৃত ব্লক বা জোটের জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ঐক্য প্রয়োজন তা এখানে এখনো অনুপস্থিত। বরং এটি একটি “Situational Alignment” বা পরিস্থিতিনির্ভর সমঝোতা যা নির্দিষ্ট সময় এবং স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে যদি পশ্চিমা চাপ আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে এই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং একটি আনুষ্ঠানিক জোটে রূপ নিতে পারে। তবে একইভাবে, যদি পারস্পরিক প্রতিযোগিতা বা স্বার্থের সংঘাত বৃদ্ধি পায়, তাহলে এই সংযোগ দুর্বল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অতএব, চীন-রাশিয়া-ইরান সংযোগকে একটি সরল বা একমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। এটি একদিকে যেমন গ্লোবাল সাউথের পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, অন্যদিকে এটি একটি জটিল, পরিবর্তনশীল এবং বহুমাত্রিক সম্পর্ক, যা ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এই সংযোগ একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার সম্ভাবনা তৈরি করলেও সেটি এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি এবং এর ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, অর্থনৈতিক প্রবণতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর।
এই সংযোগকে “নতুন ব্লক” হিসেবে আখ্যায়িত করা কিছুটা অতিরঞ্জিত, আবার এটিকে শুধুমাত্র একটি সাময়িক সমঝোতা হিসেবে দেখাও যথেষ্ট নয়। এটি বরং একটি “Evolving Strategic Alignment” যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং বিশ্ব রাজনীতির নতুন অধ্যায় রচনার সম্ভাবনা বহন করছে।
Comments